দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া মানে শুধু ক্ষমতার আসনে বসে থাকা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ানো নয় বরং জনগণের জানমাল, নিরাপত্তা, অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেওয়া। অথচ দেশের সাধারণ মানুষ যদি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সরকারের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। মানুষ সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে নিজেদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য, পুরোনো শোষণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির জায়গায় নতুন মুখের একই দৌরাত্ম্য দেখার জন্য নয়। জনগণ ভোট দেয় নিরাপদে বসবাস করতে, নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে, ন্যায্য মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এবং আইনের শাসনের অধীনে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন হলেও যদি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের প্রকৃত সুফল কোথায়? রাজনৈতিক দলের পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মানুষের সম্পদ ও ব্যবসা দখল, চাঁদাবাজি কিংবা সন্ত্রাসের অভিযোগকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্র ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, আর জনগণও কোনো দল বা ব্যাক্তির অনুগত প্রজা নয়। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে মনে রাখতে হবে ক্ষমতা ভোগ করার অধিকার নয়, এটি জনগণের কাছে একটি গুরুদায়িত্ব। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ আর কত দিন এসব অনিয়ম ও দৌরাত্ম্যের বোঝা বহন করবে? সরকার যদি সত্যিই জনস্বার্থে কাজ করতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক বক্তব্য ও আশ্বাসের বাইরে এসে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী মক্কা অঞ্চলে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের কনস্যুলার মিশন আগে থেকে এ বিষয়ে অবহিত ছিল না বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিষয়টি জানতে পেরে বাংলাদেশ বর্তমান তারেক রহমানের বিএনপি সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এবং সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি তুলেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দুই নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বাংলাদেশ আগে জানতে পারল না কেন? তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনগত সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য আপিলের সুযোগ সম্পর্কে সরকার কী জানত? এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারের কাছ থেকে পাওয়া জরুরি। প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব শুধু ঘটনার পর ব্যাখ্যা চাওয়া নয়, বরং কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যথাসম্ভব সহায়তা নিশ্চিত করা। বিএনপি সরকারের কাছে তাই স্পষ্ট জবাবদিহি দাবি করা প্রয়োজন এই ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও স্বচ্ছ জবাবদিহি প্রয়োজন।
ড. ইউনূসকে হেনস্তা: বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে ধরে অপমানজনক স্লোগান, হেনস্থা ও কটূক্তির ঘটনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সরকারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একজন নোবেলজয়ী ও বাংলাদেশ অন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত, বিদেশের মাটিতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সরকারের দায়িত্ব কী? সরকার কি শুধু ক্ষমতার আসনে বসে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেবে, নাকি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নেও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে? ড. ইউনূসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত কিংবা তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে একজন ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে ঘিরে ধরে অপমান করার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও বড় প্রশ্ন হাজির করেছে: বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা কি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন? সরকার কি সম্ভাব্য বিক্ষোভের বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিল? যদি অবগত থেকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আর যদি অবগত না থাকে, তাহলে বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রম কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেবল জাতীয় পতাকা ও সরকারি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার অর্থ হলো দেশের মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। এই দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে তার জবাব দিতে হবে।
চাঁদপুরে ছাত্রদলের হামলা: বিএনপি সরকারের আমলে আইনের শাসন কোথায়?
চাঁদপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় ছাত্রশক্তি ও জাতীয় যুবশক্তির নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদপুর বড় স্টেশন এলাকায় জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান তানিমকে অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করা হয় বলে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তাঁর মুখ ও পায়ে আঘাত লাগে। এরপর এই ঘটনার বিচার চাইতে থানায় গেলে সন্ধ্যায় আবারও এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর বর্তমান বিএনপি সরকারের পালিত সন্ত্রাসী ছাত্রদল হামলা করে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মানুষ যখন বিচার চাইতে পুলিশের কাছে যায়, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ চাঁদপুরে পুলিশ পালিয়েছিল এবং এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিএনপি যদি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় থাকা আর বাস্তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা করা এক বিষয় নয়। বিএনপি সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ শুধু বক্তব্য শুনতে চায় না, তারা নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি দেখতে চায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না। যে রাজনীতিতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে, সেই রাজনীতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, বরং জনগণের আস্থা দুর্বল করে।
সালমান মুক্তাদিরের অফিস ভাঙচুর: জনগণের বাকস্বাধীনতা কোথায়?
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে ভয়াবহ কিছু প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ECB চত্বরে তার স্টুডিওতে হামলার পর সালমান অভিযোগ করেছিলেন, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই তার প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে এবং তিনি বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার এই অভিযোগ প্রকাশিত হলেও পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পরে বলেছে প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটির সঙ্গে একটি জমি বিরোধের সম্পর্ক পাওয়া গেছে এবং চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তৈরি হয় একজন নাগরিক যদি প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি সরকারের দায়িত্ব নয়? অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্ত করে আদালত ও আইন নির্ধারণ করবে। কিন্তু কোনো অভিযোগের জবাব যদি রাজনৈতিক চাপ, ভয় দেখানো, সামাজিক হেনস্তা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা। বিএনপি যদি সত্যিই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত না থাকে, তাহলে তাদের উচিত আইনি তদন্তকে স্বাগত জানানো এবং অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করা, সমালোচকের কণ্ঠ বন্ধ করার পরিবেশ তৈরি করা নয়। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে তার দায়িত্ব বিরোধী মতকে ভয় দেখানো নয়, বরং নিজের আচরণ দিয়ে প্রমাণ করা যে জনগণ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে।
