উত্তরার মতো রাজধানীর একটি অভিজাত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাবার চোখের সামনে থেকে দশম শ্রেণির এক কিশোরী শিক্ষার্থীকে অপহরণের ঘটনা শুধু একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। ২২ এপ্রিল পরীক্ষা শেষে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে সাত থেকে আটজন দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে একটি কিশোরীকে টেনে নিয়ে প্রাইভেট কারে তুলে নেয়, অথচ আশপাশে বহু মানুষ উপস্থিত ছিল এবং যানবাহনের চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। তবুও কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকরভাবে বাধা দিতে পারেনি, যা সমাজের নিরাপত্তা সংস্কৃতি নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপদ বলে বিবেচিত এলাকাগুলোতেও নাগরিক নিরাপত্তা কতটা নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। একটি শিশু বা কিশোরী যদি তার বাবার হাত থেকে এভাবে প্রকাশ্যে অপহৃত হতে পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেই প্রশ্ন এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন তৈরি করা নয়, বরং সেই আইনের বাস্তব ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ঘটনায় সেটির স্পষ্ট ঘাটতি ও ব্যর্থতা দৃশ্যমানভাবে সামনে এসেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সরকারের সমালোচনা ও কার্টুন শেয়ারেই কারাগার: ভিন্ন মত দমনে ফ্যাসিবাদী আচরন করছে সরকার
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইফকে নিয়ে ফেসবুকে একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ও সমালোচনা করার অভিযোগে এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেফতার করার ঘটনা আবারও দেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি কে নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র শেয়ার করেছিলেন, যেটি পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টিতে আপত্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমার ব্যক্তিগত মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য খুবই উদ্বেগজনক। কারণ একটি সমাজে ব্যঙ্গ, সমালোচনা এবং কার্টুন সবসময়ই রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদি শুধুমাত্র একটি শেয়ার বা মত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজের মত প্রকাশ থেকে সরে আসবে। নুরুল ইসলাম মনি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকা উচিত, কারণ গণতন্ত্রে সমালোচনা দমন করা নয় বরং তা গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের রাজনীতি: বিসিবি থেকে মানবাধিকার কমিশন
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি এখন ক্রমশ একটি ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে সরে এসে রাজনৈতিক প্রভাবের এক প্রতিচ্ছবিতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিচয় বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ, ইসরাফিল খসরু কিংবা রাশনা ইমামের মতো নামগুলো কেবল ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানেই সুযোগের একচেটিয়া অধিকার। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের বংশগত ও রাজনৈতিক প্রভাব খোলামেলাভাবে জায়গা করে নেয়, তখন সেটি আর জনগণের প্রতিষ্ঠান থাকে না, বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিসিবির ভেতরে যে অস্বচ্ছতা, পক্ষপাতিত্ব এবং গোপন সমঝোতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দেশের ক্রিকেটকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত ক্রিকেটের উন্নয়ন, প্রতিভা খোঁজা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কিন্তু সেখানে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে, তাহলে সেটি আর ক্রীড়া উন্নয়নের জায়গা থাকে না এটি পরিণত হয় ক্ষমতার আরেকটি খেলায়।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা, তাপস ও সেলিম জড়িত
পিলখানা হত্যাকাণ্ড ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহ চলাকালে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয় যা Bangladesh Rifles Mutiny নামে ইতিহাসে চিহ্নিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক অমোচনীয় ও ভয়াবহ কলঙ্ক হিসেবে রয়ে গেছে। এই ঘটনার ভয়াবহতা শুধু নিহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনের অন্ধকার সত্য, পরিকল্পনা, এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আজও অনিরসনীয় রয়ে গেছে, সেগুলোই জাতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে শাকিলের ছেলে রাকিন আহমেদের বক্তব্যে যখন সরাসরি Sheikh Hasina, Fazle Noor Taposh এবং Sheikh Selim-এর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে, তখন সেটিকে শুধু আবেগ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ বলে খারিজ করা অত্যন্ত সহজ এবং বিপজ্জনক মনোভাব হয়ে দাঁড়ায়। বরং এই ধরনের অভিযোগ রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত, যা উপেক্ষা করা মানে জনগণের আস্থার প্রতি অবমাননা করা। একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, যদি এই অভিযোগগুলো সত্য না হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উন্মোচন করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দোষতা প্রমাণ করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত বছর পেরিয়ে গেলেও যে ধোঁয়াশা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং তথ্যের অস্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে, তা বরং জনমনে সন্দেহকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে তুলছে। যখন একটি রাষ্ট্র নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এত বড় অভিযোগের পরিষ্কার ও গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে পড়া স্বাভাবিক হয়ে যায়, আর সেটিই আজ সবচেয়ে বড় ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
সরকারের সংবিধান সংস্কার ব্যর্থতায় রাজপথে আন্দোলনে নামবে জনগণ
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে যে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির প্রতি এক ধরনের অবহেলার পরিচয়। সাধারণত, কোনো দেশের সংসদই হয় সমস্যার সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ন্যায়বিচার, নিয়ম-কানুন এবং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দেখা যাচ্ছে যে, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলগুলো বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপন করেছে, স্পষ্ট যুক্তি প্রদান করেছে এবং সময়োপযোগী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান সদিচ্ছা দেখা যায়নি। এটি শুধুমাত্র বিরোধী দলের প্রতি অসম্মান নয়, বরং জনগণের আশা ও প্রত্যাশার প্রতিও অগণতান্ত্রিক অবজ্ঞা। এক রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব শুধু নীতিনির্ধারণ নয়, বরং জনমতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারের উচিত দ্রুত এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে পরিষদের কার্যক্রম শুরু করা এবং একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ উপস্থাপন করা, যাতে সংসদ ও দেশের জনগণ উভয়ই সরকারের নীতি ও কার্যক্রমে আস্থা রাখতে পারে। জনগণ কেবল বসে থাকতে চায় না, তারা চায় তাদের ভোট ও গণভোটের মতামতের ফলাফল বাস্তবায়িত হোক।
