বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণকে বলেছিল তারা দুর্নীতি করবে না, লুটপাট করবে না, রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির মুখোশ দ্রুত খুলে যাচ্ছে। বর্তমান তারেক রহমানের সরকার মেগা প্রজেক্টের নামে আবারও বড় বড় প্রকল্প, বড় বড় বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দ ঘিরে দুর্নীতি শুরু করেছে। যে বিএনপি একসময় আওয়ামী লীগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের কাছে জবাবদিহির কথা বলেছিল, আজ তাদের আমলেই মানুষ একই ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে। পার্থক্য শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র কি বদলেছে? কয়েক দিন আগে পুলিশের একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওসি পদায়ন নিয়েও কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের বিষয় সামনে এসেছে। একটি থানার ওসি হতে যদি কোটি টাকা লাগে, তাহলে সেই টাকা তোলার জন্য পরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কীভাবে টাকা আদায় করা হবে, সেটা জনগণ জানে ও বুঝে। পুলিশ যদি জনগণের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান না হয়ে পদ কেনাবেচার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে আইনের শাসন কোথায়? বিএনপি ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্নের জায়গায় মানুষের সামনে ফিরে আসছে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই নতুন সংস্করণ। জনগণ জানতে চায়, বিএনপি কি সত্যিই দুর্নীতি বন্ধ করতে ক্ষমতায় এসেছে, নাকি শুধু দুর্নীতির ভাগাভাগিতে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে এসেছে?
বিএনপি আর আওয়ামী লীগের যেখানে মিল: দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও চাঁদাবাজির রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে অনেক সময় পরস্পরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে দেখলে, ক্ষমতার রাজনীতির কিছু মৌলিক চরিত্রে তাদের মধ্যে অস্বস্তিকর মিল রয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিন্নমতকে চাপ দেওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসব বিষয় দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি একই ধরনের অভিযোগ ছাত্রদল বা অন্য কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে, তাহলে শুধু সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। আমার কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যে রাজনীতির বিরুদ্ধে বিএনপি একসময় জনগণের সমর্থন চেয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই একই ধরনের আচরণের অভিযোগ যদি তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে পরিবর্তনটা কোথায়? শুধু আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি বসানো যদি পরিবর্তনের অর্থ হয়, তাহলে সেটি কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কার নয়। জনগণ দল বদল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার চরিত্র বদল দেখতে চায়।
রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বিএনপির দখলদারিত্ব
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে শ্রমিক কল্যাণ, সরকারি করপোরেশন, আইনজীবী প্যানেল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজ দলীয় বিএনপিপন্থী ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ মো. শামসুল আলম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য থাকা শামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এমন একজন ব্যক্তির নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। (bdnews24.com) নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে একজন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগ যদি জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি করে, তাহলে সেই দায় সরকারেরই। তারেক রহমানের সরকারকে তাই প্রশ্ন করতে হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে দলীয়করণের অভিযোগ বিএনপি বছরের পর বছর করেছে, ক্ষমতায় এসে সেই একই স্বৈরাচারী সংস্কৃতি কেন অনুসরণ করছে? একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থাই যদি নিয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নির্বাচন যতই নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হোক, তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বিএনপি যদি সত্যিই গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে থাকে, তাহলে তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখা।
দেশজুড়ে ছাত্রদল সন্ত্রাসীদের ত্রাসের রাজত্ব
দেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, হয়তো এবার তারা ভয়, দমন-পীড়ন, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পেশিশক্তির সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে সেই আশার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের রাজনৈতিক মিত্র ও ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একের পর এক হামলা, গুম, খুন,হত্যা, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সামনে আসছে। সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নে ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় আহত আব্দুর রকিব ঝনুর মৃত্যুর খবর আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ৮ আগস্ট রাতে শ্রীডাঙার মোড়ে হামলায় লোহার রডের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বিএনপি ও তাদের সন্ত্রাসী ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের হামলায় এ সহিংসতার ঘটিয়েছে, তাহলে প্রশ্ন শুধু কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক বিএনপির সংস্কৃতি নিয়ে, প্রশ্ন ওঠে সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের নিরাপত্তার কথা বলা সহজ কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের সংগঠনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই আসল পরীক্ষা। আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যদি রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করার সাহস দেয়, তাহলে রাষ্ট্রের আইন কোথায় দাঁড়ায়? সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করে, তাহলে ছাত্রদল বা বিএনপির পরিচয় কোনো অপরাধীর জন্য ঢাল হতে পারে না।
তারেক রহমান কি শেখ হাসিনার পথেই হাঁটছেন?
জনাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আপনাদের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল ক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। অথচ আজ আপনাদের সরকারের ক্ষেত্রেই যদি একই ধরনের প্রবণতার জন্ম নেয়, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে, পরিবর্তনটা আসলে কোথায়? ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর আচরণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি, চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আপনি ও আপনার দলের কাউকে নিয়ে কথা বললেই হামলা, মামলা নিয়ে অভিযোগ ও সমালোচনা উঠছে, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একজন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করা যাবে, তাঁর নীতির প্রশংসা করা যাবে, কিন্তু তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। আরও হতাশার বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে এসব অভিযোগের পরও আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট কঠোর ও স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা জনগণের সামনে আসছে না। আপনার নীরবতা যদি সম্মতি না-ও হয়, তবুও সেটি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে। আপনি কি সত্যিই চান আপনার চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হোক, যেখানে আপনার সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে? যদি না চান, তাহলে এখনই স্পষ্ট করুন প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁর দলের কোনো নেতাকর্মীও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
