২০১৬ সালটি গত হয়েছে। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে অতীতের সারিতে স্থান করে নিয়েছে গত ৩১ ডিসেম্বর সূর্যাস্তের সাথে সাথে। এখন চলছে গত বছরটি নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ। প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ব্যালেন্স শিট মেলাতে ব্যস্ত সবাই। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, মোট কথা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ২০১৬ সাল কী দিয়ে গেল বা কী নিয়ে গেল তারই চুলচেরা বিশ্লেষণে রত হয়েছেন অনেকে।
বিশেষত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলিই প্রায় সবার হিসাব-নিকাশের খাতায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বলে নেয়া দরকার, আমাদের দেশে রাজনীতিই অন্যসব বিষয়ের মূল উৎস বলে মনে করা হয়। অর্থনীতির সঙ্গে যেমন রাজনীতির সম্পর্ক, আবার সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিতেও রাজনীতির প্রভাব অনস্বীকার্য। ফলে সামগ্রিক কোনো আলোচনায় বসলে রাজনীতিই হয়ে উঠে মূল আলোচ্য বিষয়।
গত কয়েক বছরের মধ্যে সদ্য গত হওয়া ২০১৬ সালটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা স্থিতিশীল, নিস্তরঙ্গ কিংবা দৃশ্যত শান্ত ছিল বলে ধরে নেয়া যায়। ২০১৫ সালটি যেমন চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, আর অস্বস্তিকর পরিবেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, ২০১৬ তেমনটি ছিল না। বিশেষত ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে ওই বছরের (২০১৫) শুরুতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, গত বছর তা হয়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএন পির মধ্যে মধ্যে যে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল, সমাবেশের অনুমতি না দেয়া এবং বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখায় ২০১৫ সালে সৃষ্টি হয়েছিল চরম অস্থির পরিবেশ।
গত বছর ৫ জানুয়ারিতে সমাবেশের জন্য সরকার বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান না দিলেও নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দেয়ায় পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে গড়ায়নি। এক্ষেত্রে সরকার যেমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি বিএনপিও সংযতথেকে সুবিবেচনা প্রসূত কাজ করেছে। যদিও অনেকেই মনে করেন যে, ২০১৫ সালের ‘লাগাতার অবরোধ’ কর্মসূচি থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা সংযত থাকতে বাধ্য করেছে। ওই আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এখনো রাজপথে হরতাল-অবরোধের মতো সংঘাত সৃষ্টিকারী কর্মসূচি গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে।
তবে এত কিছুর মধ্যেও ২০১৬ সালে বিএনপির দুটি ক্ষেত্রে ভালো অর্জন আছে। একটি হলোÑ নির্বাচন কমিশন গঠনকল্পে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ, অপরটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শক্তিমত্তা প্রদর্শন। নয়া নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বিএনপি। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সংলাপের আয়োজন করেছেন এবং বিএনপিকে দিয়েই সেটা শুরু করেছেন। ফলাফল শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন এটা নিঃসন্দেহে বিএনপির একটি অর্জন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের ফলাফল বিপক্ষে গেলেও এ উপলক্ষে দলটির নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ পেয়েছে। এটাও দলটির জন্য কম প্রাপ্তি নয়।
বস্তুত ২০১৬ সালেও বিএনপিবআওয়ামী লীগের সাথে পেরে ওঠার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে দলটির নেতা-কর্মীরা হয়তো কৈফিয়তের সুরে বলবেÑ ‘সরকার আমাদেরকে মাঠে নামতে দেয় না, কীভাবে রাজনীতি করব?’ দলের মহাসচিব যখন বলেন, ‘সরকারের জুলুম-নির্যাতনের পরেও বিএনপি যে টিকে আছে সেটাই বা কম কিসে’Ñ তখন সাধারণ নেতা-কর্মীদের মনের অবস্থা কী হতে পারে তা অনুধাবন করা খুব একটা কঠিন নয়। কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন ‘তাহলে বিএনপি কী শুধু কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টাই করে যাবে? সামনে এগোনোর কোনো চেষ্টাই কি আর করবে না? এ প্রশ্নের জবাব আগামী দিনগুলোতেই হয়তো পাওয়া যাবে। তবে এই দুঃসময়েও দলটির কতিপয় নেতা আত্মস্বার্থে যেভাবে দলীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করছেন না, তাতে আগামী দিনে দলটি কতটা এগোতে পারবে তা নিয়ে সন্দিহান না হয়ে উপায় কী?
