CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮: জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সেনাবাহিনীর সাথেই হবে চূড়ান্ত যুদ্ধ

বাংলাদেশ একটি সংকটময় সময় পার করছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে, কিন্তু জনগণের ভেতরে যে ভয়, যে হতাশা, এবং যে ক্ষোভ জমে উঠছে, তা আর সাধারণ কিছু নয়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন মানে কেবল ব্যালটবাক্সে ভোট ফেলা নয়- এটা এখন জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে সরকারপন্থী হয়ে উঠছে, তাতে প্রশ্ন জাগে- এবার কি সেনাবাহিনীও আওয়ামীলীগ সরকারের আরেকটি দলীয় বাহিনী বা গোলামে পরিণত হবে? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কথাও আমরা ভুলিনি। ইতিহাসের এক কলঙ্কিত নির্বাচন ছিল সেটি- যেখানে ১৫৩টি আসনে কোনও ভোটই হয়নি, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। বিরোধী দল বর্জন করেছিল নির্বাচনের মাঠ, আর সরকার ‘নির্বাচন’ নামক নাটক চালিয়ে গিয়েছিল সেনাবাহিনীকে নিস্তব্ধ পাহারাদার বানিয়ে। মানুষ ভোট দিতে পারেনি, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। সেদিন সেনাবাহিনী ছিল মাঠে, কিন্তু ছিল যেন এক নির্বাক, নিস্তেজ প্রতিমা- যারা দেখতে পেয়েছে ভোটহীন নির্বাচন, প্রশাসনিক সন্ত্রাস, অথচ কিছু বলেনি, কিছু করেনি। এমনকি মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে একতরফা বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছিল। যারা জনগণের নিরাপত্তার শপথ নিয়ে বন্দুক হাতে মাঠে নামে, তারা সেদিন ছিল সরকারের দেহরক্ষী মাত্র। সেই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়- যদি সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ না থাকে, তবে নির্বাচন মানেই একটি নাটক, যেখানে জনগণের ইচ্ছা নয়, সরকারই সিদ্ধান্ত নেয় কারা ‘জিতবে’।

আমরা সেনাবাহিনীকে জাতির রক্ষক মনে করি। কিন্তু যদি এই রক্ষকই হয় স্বৈরশাসককের গোলাম, তবে কী আমাদের কিছু বলার থাকবে না? সেনাবাহিনী যদি জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়, যদি তারা একপক্ষীয় নির্বাচনকে বৈধতা দিতে মাঠে নামে, যদি তারা ভোটাধিকার হরণে শাসককে রক্ষা করে- তবে সেই সেনাবাহিনী আর দেশের নয়, তারা সরকারের প্রাইভেট মিলিশিয়া মাত্র। তখন তারা গণবিরোধী অপশক্তির অংশ, যারা জনগণের রক্তে চুষে ক্ষমতার বসতে চায়। এমন বাস্তবতায় প্রতিরোধ শুধু অধিকার নয়, বরং দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কেউ যদি প্রশ্ন তোলে- সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কেন? আমি বলবো, বিদ্রোহ নয়- এটা আত্মরক্ষা। নিজের অধিকার রক্ষার লড়াই। এটা দেশবিরোধী নয়, বরং দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ রূপ। যে সেনাবাহিনী সরকারের ক্রীতদাস হয়ে জনগণের পিঠে গুলি চালায়, সে সেনাবাহিনী জনগণের শত্রু। আর আমরা জানি, বাংলাদেশীরা শত্রুর বিরুদ্ধে কখনো মাথা নত করে না।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কথাও আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। সেই একতরফা, ভোটারবিহীন নির্বাচনে সেনাবাহিনী ছিল মাঠে, কিন্তু তারা জনগণের পক্ষে নয়, বরং সরকারের নির্বাক পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার কেন্দ্র ছিল ফাঁকা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, কিন্তু সেনাবাহিনী একটিবারও প্রশ্ন তোলেনি কেন জনগণ ভোট দিতে পারছে না। তারা প্রতিরোধ করেনি কেন রাষ্ট্রীয়ভাবে ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে। এমনকি যেসব এলাকায় মানুষ প্রতিবাদে নেমেছিল, সেখানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির মাঝেই পুলিশ-র‌্যাব-প্রশাসন মিলে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। এই নীরবতা, এই নিষ্ক্রিয়তা আসলে এক ধরনের অংশগ্রহণ- একটি একদলীয় নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার নীরব ষড়যন্ত্র। অতএব, যদি আসন্ন ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও তারা একই ভূমিকা নেয়- সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে জনগণের কণ্ঠ রোধ করে- তাহলে জনগণের প্রতিরোধ শুধু যুক্তিযুক্ত নয়, বরং অপরিহার্য। তবে এবার আর নীরবতা থাকবে না। এবার জনতার ঘরে ঘরে আগুন জ্বলবে। প্রতিরোধ হবে, সংগ্রাম হবে, যুদ্ধ হবে। কারণ একথা সত্য- জনগন যখন নিজের অধিকার, ভোটাধিকার, দেশের গনতন্ত্র হারিয়ে ফেলে, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সভ্যতার দাবি।

অনেকেই বলে, “এই কথাগুলো রাষ্ট্রদ্রোহ।” আমি জিজ্ঞেস করি, রাষ্ট্র মানে কী? সরকার নয়। দল নয়। রাষ্ট্র মানে জনগণ। যারা জনগণের গলা চেপে ধরে, তারা রাষ্ট্র নয়, তারা রাষ্ট্রশত্রু। আর রাষ্ট্রশত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই রাষ্ট্রপ্রেম। আজ যে যুবকরা রাজপথে, যারা কলম ধরে, যারা ক্যামেরা ধরে সত্য তুলে ধরে- তারা দেশের আসল সৈনিক। আর যদি সত্যি সেনাবাহিনী সরকারের একদলীয় বাহিনী বা গোলামে পরিণত হয়, তবে সেই তরুণরাই হবে আসল মুক্তিযোদ্ধা। আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা রক্তপাত চাই না। কিন্তু যদি সেই রক্তপাত চাপিয়ে দেওয়া হয়? যদি জনগণের কণ্ঠরোধ করতে ট্যাংক নামানো হয়? যদি সেনাবাহিনী জনগণের মুখে চাবুক চালায়- তবে আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব না। আমরা পালাব না। আমাদের পূর্বপুরুষরা যেমন একদিন রাইফেলের মুখে লাঠি হাতে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি আমরাও দাঁড়াবো। আমরা সেনাবাহিনীকে শেষবার সুযোগ দিতে চাই- আসন্ন ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর। নিরপেক্ষ থাকার। সরকারের গোলাম না হয়ে স্বাধীন অস্তিত্ব হিসেবে কাজ করার। কিন্তু যদি তারা সেই সুযোগ নষ্ট করে, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। জনগণও না। বাংলাদেশ আমাদের। এদেশে আবার একটি মুক্তিযুদ্ধ লাগবে কিনা, সেটা নির্ধারণ করবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা। আমরা আশা করবো তারা ইতিহাসের সঠিক পাশে থাকবে। কিন্তু যদি না থাকে- তবে ইতিহাস গড়ে তোলার দায়িত্ব আবারও জনগণকেই নিতে হবে।