বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রধান ধারার মধ্যে আটকে আছে: জিয়াবাদ ও মুজিবাদ। এই দুটি ধারার মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং আওয়ামী লীগ। একদিকে আছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে চালিত জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে পরিচালিত আওয়ামী লীগ। অথচ দেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনীতি আজও জনগণের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ বারবার বলেছে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক। কিন্তু তাদের শাসনামলে দেখা গেছে বিরোধী দলকে দমন, স্বাধীন বিচার বিভাগের উপর প্রভাব, এবং নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর প্রবণতা। এদিকে বিএনপি ক্রমেই একটি পরিবারকেন্দ্রিক দল হয়ে উঠেছে। খালেদা জিয়া এবং তার সন্তান তারেক রহমানকে ঘিরে দলটি আবর্তিত হচ্ছে। এটি গণতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আওয়ামী লীগের মুজিবাদ: একচ্ছত্র ক্ষমতার লালসা: বিএনপিকে শায়েস্তা করার নামে দলটি যে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করেছে, তা মূলত একদলীয় শাসনের পথ সুগম করেছে। বিরোধী মত দমনে তাদের নিষ্ঠুরতা প্রশ্নবিদ্ধ। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে দুর্নীতি করেছিল। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে প্রতিটি বড় প্রকল্পে কমিশন-কেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপির জিয়াবাদ: হতাশাজনক জাতীয়তাবাদ: বিএনপি জাতির জন্য একটি কার্যকর বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হতে পারত। কিন্তু তারা একদিকে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যর্থ, অন্যদিকে রাজনীতিতে গঠনমূলক ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দলটির নেতৃত্ব গত এক দশকে মাঠপর্যায়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আন্দোলনে ব্যর্থতা, অকার্যকর নেতৃত্ব এবং দলীয় বিভাজন বিএনপির শক্তি কমিয়ে দিয়েছে। বিএনপির শাসনামলও দুর্নীতির কারণে কলঙ্কিত। তাদের সময়কার হাওয়া ভবনের দুর্নীতি এবং সরকারের ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে দলটির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।
জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে মনোযোগী। বিরোধী দল দমন করা, গুম-খুন চালানো, এবং নিজেদের সমালোচনাকারীদের কণ্ঠরোধ করা এই দুই দলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
জিয়াবাদ এবং মুজিবাদের বাইরে এসে নতুন, তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন জরুরি, যারা গণতন্ত্র এবং সুশাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং তাদের বুঝতে হবে যে রাজনীতি কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং দেশের সেবা করার একটি মাধ্যম। জিয়াবাদ এবং মুজিবাদ আমাদের রাজনীতির শেকলে পরিণত হয়েছে। এই দুই ধারার বাইরে এসে দেশকে নতুন পথ দেখাতে হবে। দেশের রাজনীতি আজ এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চায়, যেখানে গণতন্ত্র, সুশাসন, এবং সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে। আমাদের উচিত দলীয় দাসত্ব ছেড়ে প্রকৃত অর্থে একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা।
