বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কি শুধুই একটি ভৌগলিক সীমারেখা, নাকি এটি একটি বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে? যখন একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি—যার বিরুদ্ধে গুরুতর হত্যা মামলা, যার রাজনৈতিক ভূমিকা গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করেছে—তিনি দিব্যি মামলা মাথায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিদেশ চলে যান, তখন আর একটুও সন্দেহ থাকে না যে, এই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাথে নিষ্ঠুর প্রতারণা করে চলেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, যিনি শুধু একবার নয়, একাধিকবার স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী ও উপকারভোগী ছিলেন, তিনি আজ আইনের চোখে একজন অভিযুক্ত হলেও বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কিভাবে? কোন পদ্ধতিতে? আর কেনো প্রশাসন নীরব? এটি একটি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের কাছে কঠিন প্রশ্ন।
আবদুল হামিদ একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, পরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সংসদীয় রাজনীতির বড় মুখ হয়ে উঠেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কালো অধ্যায় শুরু হয় তখন, যখন তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন। এ সময় তিনি সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সুবিধা রক্ষা করেছেন। বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখেননি, যা তাঁকে স্বৈরাচারের দোসর বানাতে যথেষ্ট।
একজন রাষ্ট্রপতি যখন নিরপেক্ষ না থেকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করেন, তখন তিনি কেবল ব্যক্তিগতভাবে দোষী নন—তিনি পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। হামিদ সেটিই করেছিলেন। এখন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি কিভাবে দেশ ছাড়লেন, তা নিয়ে যত প্রশ্ন উঠছে, তা স্বাভাবিক। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একজন মামলাভুক্ত ব্যক্তি যখন দেশের বাইরে যান, তখন তাঁর পাসপোর্টে ‘লুকআউট নোটিশ’, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, কিংবা প্রশাসনিক সতর্কতা থাকা উচিত। অথচ হামিদের বেলায় কিছুই দেখা যায়নি। তিনি দিব্যি ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেন। তাহলে কি ইমিগ্রেশন বিভাগ অন্ধ? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছে? বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক যদি মামলার আসামি হন, তবে তাঁকে বিমানবন্দরেই আটকে দেওয়া হয়। কোনো কারণ ছাড়াই ইমিগ্রেশন ‘হোল্ড’ করে। অথচ সাবেক রাষ্ট্রপতি হলে কি সব আইনের ঊর্ধ্বে? এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইমিগ্রেশন বিভাগ হয় অদক্ষ, নয়তো দুর্নীতিগ্রস্ত। এবং এই দুইয়ের দায় রাষ্ট্র ও সরকারকেই নিতে হবে।
আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত সরকারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, এটি সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদনেই হয়েছে? বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন সরকার তাদের পুরনো দোসরদের বিরুদ্ধে মুখ খোলে না। বরং কোনো না কোনোভাবে তাদের রক্ষা করে। এবারও কি তাই হচ্ছে? এই নীরবতা শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। কারণ, একটি গণতান্ত্রিক সরকার যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে সে নিজের লোকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়।
সরকার পাল্টালেও প্রশাসনের মনোভাব পাল্টায়নি। আজও বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ আমলারা সেই পুরনো আমলের অনুগত, যারা আওয়ামী লীগের সময় নানা সুবিধা পেয়েছে। এদের কেউ কেউ প্রশাসনে বসে আজও সেই দলকেই সেবা দিয়ে চলেছে। এই লোকজনরা এখনো বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে, তথ্য গোপন করছে এবং দুর্নীতিকে আড়াল করছে। ফলে হামিদের মতো লোকদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না তারা। সরকারও যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বুঝতে হবে সরকার নিজেই এই ষড়যন্ত্রের অংশ।যেখানে একটি মামলার আসামি বিদেশ যাচ্ছে, সেখানে আদালত কেনো কোনো নির্দেশ দেয়নি? তার পাসপোর্ট জব্দ হয়নি কেন? গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হয়নি কেন? এখানেই প্রমাণ হয় যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থা এখনো সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। আদালত যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতো, তাহলে কোনো সাবেক রাষ্ট্রপতি হলেও, তাকে বিদেশ যেতে দিত না।
আজ জনগণ জানতে চায়: কে হামিদকে বিদেশ যেতে দিয়েছে? ইমিগ্রেশন কার অধীনে কাজ করে? বিচার বিভাগ তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? সরকার কেন এই বিষয়ে নীরব? এই প্রশ্নের জবাব না দিলে এই সরকারের ওপর থেকে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। সরকার যদি সত্যিই আইন ও ন্যায়ের পক্ষে থাকে, তাহলে এখনই তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত জড়িতদের বিচার করতে হবে। স্বৈরাচারের দোসর হামিদের এই দেশত্যাগ শুধু একটি ঘটনা নয়—এটি একটি বার্তা। এই বার্তা হলো, ক্ষমতা থাকলে তুমি আইনের ঊর্ধ্বে। এই বার্তা হলো, রাষ্ট্র এখনো দুর্নীতির ঘেরাটোপে বন্দী। এই বার্তা হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হয়তো জনগণের চেয়ে বেশি আগ্রহী পুরনো অপরাধীদের রক্ষা করতে। এভাবে চলতে থাকলে গণতন্ত্রের মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না। এই রাষ্ট্র আমাদের—আমরা এর জবাব চাই। এখনই সময় প্রতিবাদ, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের।
