CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

জামায়াতে ইসলামী কি বাংলাদেশে তালেবান শাসন করতে চায়?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামী কেবল একটি ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও ভয়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে। তাদের বক্তব্য, প্রচার ও আদর্শ স্পষ্টভাবে দেখায় যে তারা গণতান্ত্রিক নীতি, নাগরিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারকে নস্যাৎ করার মনোভাব পোষণ করে। তারা রাষ্ট্রকে মানুষের সেবার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, যেখানে ভিন্নমত, নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার অনিরাপদ থাকবে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, জামায়াত সবসময়ই ধর্মের নাম ভাড়া করে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করেছে, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা ও সমাজের সার্বজনীন কল্যাণকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক আচরণে রয়েছে ভয়ভীতি, সহিংসতা এবং আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা। দেশের নাগরিকদের জন্য এটি একটি গভীর হুমকি, কারণ উগ্রপন্থার ভিত্তিতে শাসন মানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দমন নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন ও মর্যাদা, শিক্ষার সুযোগ, নারীর অধিকার, ব্যবসা ও জীবিকার স্বাধীনতা সবই নিয়ন্ত্রিত হবে। যেকোনো উগ্রপন্থী শাসক বা দল যখন ক্ষমতায় আসে, তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে এবং জনগণের ওপর ভয়ভীতি তৈরি করে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রমাণিত। এই কারণে প্রশ্ন ওঠে, জামায়াত কি সত্যিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়, নাকি তারা আফগানিস্তানের তালেবানের মতো নিষ্টুর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

জামায়াতের অতীতকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বিতর্কিত ভূমিকা বিবেচনা করলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এবং অনেক জায়গায় নাগরিক ও মুক্তিকামী মানুষের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে। এই অতীত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তাদের আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার ফলাফল আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। যারা একবার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে না এটি ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে। আজও জামায়াত সেই ইতিহাসের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি, বরং বিভিন্ন সময়ে তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। অতীতের এই আচরণ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, তারা যদি ক্ষমতায় আসে, দেশের নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকে বজায় রাখতে সক্ষম হবে না। এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যও রাজনৈতিক হুমকি, কারণ উগ্রপন্থী শাসনধারা সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

আগামী মাস ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আচরণ আরও উদ্বেগজনক। তারা একজনও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে না, যা স্পষ্টভাবে তাদের নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি তাদের মনোভাব সীমাবদ্ধ, যা তালেবান শাসনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ক্ষমতায় এলে নারীদের শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণের অধিকার বিপন্ন হবে। শুধু নারী নয়, দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মুক্তচিন্তার মানুষ, অনলাইন ব্লগার, একটিভিস্ট, সাংবাদিক ও শিক্ষকেরাও একইভাবে অসুরক্ষিত হবে। জামায়াতের উগ্র ও সীমাবদ্ধ নীতি একটি ভয়ভীতিপূর্ণ সমাজ তৈরি করবে, যেখানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভেঙে পড়বে। তারা ধর্মের নামে এমন আইন ও নীতি চাপিয়ে দেবে, যা গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচার কে নস্যাৎ করবে। দেশের সব শ্রেণীর মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক এই নীতির শিকার হবে। এই কারণে জামায়াতের ক্ষমতায় আসা মানে গণতন্ত্রের ওপর স্থির হুমকি, নারীর অধিকার হ্রাস, মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা সীমিত, সংবাদিক, ব্লগার দমনপীড়ন এবং সমাজে উগ্রতার বিস্তার। জনগণের জন্য এটি একটি প্রাঞ্জল সতর্কবার্তা, যে এই উগ্র চরমপন্থী দলকে ক্ষমতায় নেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ফেলা।

সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা হলো, জামায়াত ইসলামি যদি ক্ষমতায় আসে, তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির আবারও পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং ইতিহাসে প্রমাণিত সেই সহিংস, ভয়ভীতিপূর্ণ ও উগ্র কর্মসূচিকে পুনরায় চালু করবে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে হামলা চালানো, পায়ের রগ কাটা, ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা, সাংবাদিক, ব্লগারদের উপর হামলা নির্যাতন, ভিন্নমতকে দমন করা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও আন্দোলন দমন করার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। তারা কখনো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক ছিল না; বরং এক আদর্শিক উগ্রপন্থী বাহিনী হিসেবে পরিচিত, যা যে কোনো সুযোগে সহিংসতা এবং ভয় দ্বারা ক্ষমতা ধরে রাখে। যদি জামায়াত ক্ষমতায় আসে, তারা শুধুমাত্র ক্যাম্পাস বা শিক্ষাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তাদের উগ্র কার্যক্রম পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়বে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে চরমপন্থা ও উগ্রতা বৃদ্ধি পাবে, এবং সাধারণ নাগরিক, বিশেষত সাংবাদিক, ব্লগার ও দেশের নারীরা, শিক্ষার্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী অধিকার হ্রাস, বাকস্বাধীনতার অবনতি এবং ভিন্নমত দমন এই সবই তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে চলতে থাকবে। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থা এই উগ্র শক্তির প্রভাবের মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হবে, যার ফলে সাধারণ নাগরিকরা রাষ্ট্রের সেবা ও নিরাপত্তার পরিবর্তে সহিংসতার আতঙ্কে বসবাস করবে। এটি কেবল শিক্ষাঙ্গনের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অপরাধী ও উগ্র দলগুলোর হাতে তুলে দেবে। এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে জনগণের দায়িত্ব হয়ে ওঠে অত্যন্ত সচেতন ও দৃঢ়, কারণ একবার এই দল ক্ষমতায় এলে তা শুধু গণতন্ত্রকে ধ্বংস করবে না, মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করবে, দেশীয় আইন-শৃঙ্খলা অবমূল্যায়ন করবে, এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী ক্ষতি আনবে। জনগণকে সচেতনভাবে এই উগ্র ও চরমপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং ভোট, আন্দোলন এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে এদের ক্ষমতায় আসা প্রতিরোধ করতে হবে, না হলে দেশের গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকারের ভিত্তি নস্যাৎ হয়ে যাবে।