CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

বিএনপি ভোট চুরি করে জয়ী হয়েছে

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে যে তীব্র বিতর্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকের ভোটই ক্ষমতার বৈধতা নির্ধারণ করে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ঘিরে বহু পর্যবেক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ ভোটারের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে অল্প সময়ের ব্যবধানে ভোটের শতকরা ১০ থেকে ৪০ পরে ৫৯% হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। কিছু বিএনপিপন্থী গণমাধ্যম ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই প্রায় নিখুঁত পূর্বাভাস প্রেডিকশন দিয়েছে, যা পূর্বপরিকল্পিত ভোট চুরি ও “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর ইঙ্গিত। আবার বিভিন্ন আসনে প্রথমদিকে পিছিয়ে থাকা বিএনপির প্রার্থীরা হঠাৎ করেই বড় ব্যবধানে এগিয়ে গেলো কীভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রতিবেদনগুলোতে কিছু কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে, যদিও সেগুলোর নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত এখনও সম্পন্ন হয়নি। এসব অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাই হোক, সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া এই সন্দেহ দূর হবে না। কারণ বিষয়টি কেবল একটি দলের জয়-পরাজয়ের নয়; এটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক আস্থার প্রশ্ন। সেই কারণেই ১৫০টিরও বেশি যেসব আসনে কারচুপি হয়েছে সুষ্ঠু তদন্ত করে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার অংশ হিসেবে পুনঃনির্বাচনের দাবি আমাদের আঠারো কোটি মানুষের।

একইভাবে বহু কেন্দ্রে বিরোধী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কোথাও কোথাও শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা গনতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুতর সংকেত বহন করে। একটি নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি আস্থার প্রক্রিয়া, যেখানে সব পক্ষ সমান সুযোগ পাবে এমন নিশ্চয়তা থাকতে হয়। কিন্তু যদি ভোটের দিন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, এজেন্টরা নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, কিংবা ভোটাররা চাপের মধ্যে ভোট দেন, তাহলে সেই নির্বাচন কাগজে-কলমে বৈধ হলেও নৈতিক ও গনতান্ত্রিক বৈধতা হারায়। কারচুপির অভিযোগ উপেক্ষা করে দ্রুত বিজয় উদযাপন রাজনৈতিকভাবে স্বস্তিদায়ক হতে পারে, কিন্তু তা গণতন্ত্রের ভিতকে আরও নড়বড়ে করে তোলে। জনগণ যদি বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হয়নি বা ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে, তাহলে সেই ক্ষোভ ধীরে ধীরে সংগঠিত প্রতিরোধ বা রাস্তায় আন্দোলনে রূপ নিবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অবিশ্বাস ও ক্ষোভের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না। তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো বিরোধী কণ্ঠ দমন নয়, বরং স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত তদন্ত নিশ্চিত করা। প্রয়োজন হলে পুনর্গণনা, এমনকি বিতর্কিত আসনগুলোতে পুনঃনির্বাচনের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুলে দিতে পারে। অন্যথায় “কারচুপির নির্বাচন মানি না” স্লোগান আরও বিস্তৃত জনসমর্থন পাবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

নির্বাচনের জয়ী হওয়ার পর বিএনপির সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সহিংসতার যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক ও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক নারীর ওপর নৃশংস ধর্ষণ ও নির্যাতন জনমনে গভীর ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পারিবারিকভাবে দাবি করা হচ্ছে, বিএনপিকে ভোট না দিয়ে এনসিপিকে ভোট দেওয়ায় ঘটনাটি ঘঠেছে। এ ধরনের ঘটনা যদি তদন্ত হয়, তাহলে তা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো দল ক্ষমতায় আসার পর যদি বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ক্ষমতার পরিবর্তন কখনোই প্রতিহিংসার লাইসেন্স হতে পারে না। সহিংসতা ও ভয়ভীতির রাজনীতি সমাজকে আরও বিভক্ত করে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত এসব অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখা, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং দোষীদের রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় প্রভাব বা ক্ষমতার অবস্থান বিবেচনা না করে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা। ন্যায়বিচার দৃশ্যমান না হলে শুধু ভুক্তভোগী নয়, পুরো জাতিই নিরাপত্তাহীনতার বোধে আক্রান্ত হয়।

অতীতের অভিজ্ঞতাই আজকের উদ্বেগকে আরও গভীর করে তুলছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ বিএনপির সময়কালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচকে শীর্ষ অবস্থানে ছিল এই ইতিহাস কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি তিক্ত স্মৃতি, যা এখনও জনগণের মনে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি করে। সেই সময় রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে অনিয়ম, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখনই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা জাগে পুরোনো চিত্র কি আবার ফিরে আসছে? মানুষ ভয় পায়, যদি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া এবং কার্যকর সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যক্তিগত লাভের উৎসে পরিণত হতে পারে। তখন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, কল্যাণমূলক প্রকল্প সবকিছুই সন্দেহের চোখে দেখা হবে। একটি সরকার যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে তার প্রতিটি পদক্ষেপ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিহিংসা বা প্রতিপক্ষ দমনের রাজনীতি নয়; বরং একটি জবাবদিহিমূলক, গনতান্ত্রিক স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। অন্যথায় জনগণ নিজেকে রাজনৈতিকভাবে জিম্মি ও নিরাপত্তাহীন মনে করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশে অস্থিরতা বাড়াবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বিরোধী কণ্ঠরোধে নয়; বরং সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে, ভুল স্বীকার করে এবং ন্যায়ভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠনে নিহিত।