বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সময় কিছু চরিত্র থাকে, যারা নিজ অবস্থান থেকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের ফলাফল কখনোই প্রত্যাশিত হয় না। মেজর ডালিম বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি চরিত্র, যিনি অনেকের কাছে বিতর্কিত, কিন্তু তার কর্মকাণ্ড এবং দেশের প্রতি তার উদ্দেশ্যগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদি আমরা তার দৃষ্টিভঙ্গি ও সময়ের প্রেক্ষাপট বুঝি, তবে তার কাজগুলোকে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম হিসেবে দেখা যেতে পারে।
১৯৭৫ সালের আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় সময়। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ছিল অস্থির। শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় আসার পর, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, এবং সরকারি কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জনগণের মধ্যে অস্বস্তি এবং হতাশা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে, মেজর ডালিম এবং তার সহকর্মীরা মনে করেছিলেন যে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দিশার প্রয়োজন, যেখানে মানুষের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব হবে।
মেজর ডালিমের কর্মকাণ্ড ছিল একটি বিপ্লবী মনোভাব নিয়ে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বঙ্গবন্ধুর শাসনব্যবস্থা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য আর উপযোগী নয়। সেই সময়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল প্রায় ম্লান এবং দেশ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হচ্ছিল। মেজর ডালিম এবং তার সহকর্মীরা এই অবস্থার পরিবর্তন চান, যেখানে দেশের জন্য একটি নতুন দিশা আসবে।
এটা অবশ্যই সত্য যে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা শেখ মুজিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন, কিন্তু যদি আমরা সেই সময়ে পরিস্থিতি এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখার চেষ্টা করি, তবে তারা বিশ্বাস করতেন যে তারা দেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে চান। তাদের দৃষ্টিতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আর দেশের ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী ছিল না।
মেজর ডালিমের কর্মকাণ্ড ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার জন্য, এবং তারা জনগণের কল্যাণের কথা ভাবতেন। তারা জানতেন যে, শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে গেলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা কখনো কখনো সহায়ক হয় না, কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করা। মেজর ডালিম এবং তার সহকর্মীরা মনে করতেন যে, একনায়কতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে নতুন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করলে জনগণ উপকৃত হবে।
এটি তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল, এবং তারা দেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা ছিল একটি নতুন ভবিষ্যত তৈরি করার চেষ্টা। তাদের মতে, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হলে পুরনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন অত্যাবশ্যক ছিল।
যদিও মেজর ডালিমের কর্মকাণ্ড আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়, কিন্তু তার উদ্দেশ্যগুলো যদি আমরা গভীরভাবে বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যায় যে তিনি ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তক। মেজর ডালিমের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কিত হলেও, তার উদ্দেশ্য ছিল দেশের জন্য ভালো কিছু করা। তিনি যে সংকটময় সময়ে দেশে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন, সেটি অনেকের কাছে ভুল মনে হলেও, তার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণ। মেজর ডালিমের কর্মকাণ্ডকে শুধুমাত্র বিপথগামী হিসেবে না দেখে, তাকে দেশের একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেষ্টাকারী হিসেবে দেখলে, তার ভূমিকা কিছুটা হলেও অবহেলিত এবং ভুলভাবে চিত্রিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
