বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা বছরের পর বছর ধরে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনী—বিশেষ করে র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—বিচারের নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই সন্দেহভাজনদের হত্যা করছে। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা বন্ধ হয়নি, বরং তাদের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা প্রমাণ করছে যে, তারা ক্ষমতায় আসার আগে যে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ছিল নিছক কথার ফুলঝুরি।
বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের আস্থা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশেষ করে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষা করার কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা বিচারবহির্ভূত হত্যা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।এখনো দেশে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্বরতরা নীরব দর্শকের ভূমিকায়। যারা অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যার নির্দেশ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—তাহলে পরিবর্তন কোথায়? সরকার বদলালেও পদ্ধতি ও মানসিকতা কি বদলেছে?
বিচারবহির্ভূত হত্যা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। আইনের শাসন ধ্বংস হয়ে যায়: একজন নাগরিকের অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়: সরকার যখন বিচারবহির্ভূত হত্যা করে, তখন বুঝতে হয় যে, এটি ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল। বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে: সরকারবিরোধী নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার রয়েছে, যা সরকার মেনে চলছে না।
যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তারা বলেছিল— গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে— বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি এখনো চলছে। গুম ও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। জনগণের আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় এড়াতে পারবে না।
সরকার কি দায় এড়াতে পারে?
না, কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যর্থ হয়েছে— আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাগাম টানতে পারেনি। অতীতে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে কোনো নীতি গ্রহণ করেনি।
যদি সরকার মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে এই সরকারের প্রয়োজন কী? বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতেই হবে। এটি বন্ধ করতে হলে— অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার পথ থেকে সরে আসতে হবে। অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বর্তমান সরকার যদি এই অন্যায় বন্ধ করতে না পারে, তাহলে তারা আগের সরকারের মতোই স্বৈরাচারী বলে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশকে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পথে আনতে হলে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।
