CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

ভোট ডাকাতির দায়: সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের বিচারের সময় এখন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, এবং এর অন্যতম বড় কারণ হলো নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব। একটি দেশের নির্বাচন কমিশন যত বেশি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হয়—তত বেশি সেই দেশ গণতন্ত্রে রক্ষা পায়। কিন্তু বাংলাদেশের গত ১৫ বছরের বাস্তবতায় দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন কেবল একটি গৃহপালিত প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িযছিল, যেখানে সাবেক তিনজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনগণের বিশ্বাস ভেঙেছেন এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বিকার, পক্ষপাতদুষ্ট ও জনগণ-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিলেন।

২০১৪ সালের নির্বাচন রকিবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচন বিশ্বে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, কারণ বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিধান্বিত ছিল। এই নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে একটি কৌতুকের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, এবং প্রশ্ন উঠে রকিবউদ্দিনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। তিনি তখন সরকারি প্রণোদনার আশায় চোখ বুজে একতরফা ভোটের আয়োজন করেন।

২০১৮ সালে আবারও বাংলাদেশের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাতেই ভোটগ্রহণের ঘটনা ঘটে—যা পরে সাংবাদিক, নির্বাচন কর্মকর্তা এবং বিরোধী প্রার্থীদের বয়ানে প্রকাশিত হয়। এই নির্বাচনে দিনের ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পান, তাদের ভোট আগেই পড়ে গেছে। নির্বাচনের আগেই সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রশাসন, পুলিশ ও আদালত কাজ করেছে। শত শত বিরোধী প্রার্থী মনোনয়নপত্র বাতিলের কবলে পড়েছেন, এবং অনেক জায়গায় তাদের পোস্টার পর্যন্ত টানানোর সুযোগ পায়নি। নূরুল হুদা কমিশন ছিল একটি নিঃস্বাধীন, নির্লজ্জভাবে সরকারঘেঁষা একটি দল। তিনি অনেক বিতর্কিত বক্তব্যও দিয়েছেন, যার মধ্যে ছিল—“সরকারের সহায়তা ছাড়া নির্বাচন করা যায় না।” প্রশ্ন হচ্ছে, একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যদি এ কথায় বিশ্বাস করেন, তবে তিনি কি আদৌ নির্বাচন কমিশন নামক সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে থাকার যোগ্য ছিলেন?

৭ জানুয়ারি ২০২৪ এর (ডামি) জাতীয় নির্বাচনের ইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন ছিল। তার কমিশন বারবার ‘ডায়ালগ’, ‘আলোচনা’, ‘শুধু কমিশনের হাতে কিছু নেই’ জাতীয় বক্তব্যের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁর আমলেও কোন কার্যকর সংস্কার হয়নি। বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (EVM) নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছিল। তবে তা স্বচ্ছতা আনার উদ্দেশ্যে নয়, বরং রাজনৈতিক চাপের ফলেই।

একটি দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস হয় যখন তার নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাবেক তিন নির্বাচন কমিশন একের পর এক জনগণের আস্থা হারিয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারক হয়ে উঠেছে এবং বিরোধী দল ও সাধারণ নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল। শুধু ব্যর্থতা নয়, বরং তারা যে কাজ করেছিলেন, তা গণবিরোধী, সংবিধানবিরোধী এবং ফ্যাসিবাদকে উৎসাহিত করার মতো অপরাধ—যার জন্য বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার লড়াই শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং যারা গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, তাদেরও বিচার করতে হবে। সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা যেন নির্বিকারভাবে দেশে থেকে পালিয়ে যেতে না পারেন সেদিকে আমাদের নজর রাখা উচিত। এবং বর্তমান সরকার যত দ্রুত সম্ভব গত তিন নির্বাচনের ইসিদেরকে গ্রেফতার করে বিচারের আয়তায় আনতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার যারা ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাদেরও একদিন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।