CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

স্বৈরাচার হাসিনার আওয়ামী লীগ ও ভারত সরকারের সম্পর্ক

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট খুনি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ শাসন এবং ভারতের সরকারের (বিজেপি) সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এক অস্বস্তিকর ও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায়। এই সম্পর্ক কূটনৈতিক সহযোগিতার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে এমন এক রাজনৈতিক আঁতাতের রূপ নিয়েছিল যেখানে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা, ভোটাধিকার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বারবার উপেক্ষিত হয়েছিল। ভারত কখনোই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি; বরং তারা সচেতনভাবে একটি দমনমূলক, ফ্যাসিস্ট ও জনবিচ্ছিন্ন শাসকের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিল, ভোট ব্যবস্থাকে ধ্বংস, বিরোধী কণ্ঠকে নির্মমভাবে দমন, হামলা, মামলা, গুম, খুন, নির্যাতন ও ভয়ভীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি পুলিশি শাসনব্যবস্থায় পরিণত করেছিল, এবং এই পুরো সময়জুড়ে ভারত সেই শাসনকে কেবল সমর্থনই দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রশ্ন উঠতেই পারে ভারত কেন বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে নয়, বরং একজন স্বৈরাচারী শাসকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ক্ষমতা ও স্বার্থের রাজনীতিতে। ভারত জানে, জনগণের সরকার হলে স্বাধীন সিদ্ধান্ত আসবে, আঞ্চলিক আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়বে; তাই তারা গণতন্ত্রের পরিবর্তে একজন আজ্ঞাবহ স্বৈরাচারকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এই সম্পর্ক কোনো বন্ধুত্ব নয়, এটি জনগণের বিরুদ্ধে গড়া এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক জোট, যার মূল্য বাংলাদেশ বারবার দিয়েছে তার গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রক্ত দিয়ে।

খুনি স্বৈরাচার হাসিনা আজ ভারতে পালিয়ে আছে, অথচ তার শাসনের সময় যে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছিল, গুম, নির্যাতিত হয়েছিল, যাদের জীবন ধ্বংস হয়েছে, সেই দায় এড়ানোর সুযোগ তাকে দেওয়া হয়েছে। আরও ভয়াবহ হলো, তার শাসনযন্ত্রের বহু খুনি, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী আজও ভারতের আশ্রয়ে নিরাপদে আছে। এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি সরাসরি অবমাননা। যখন ভারত এসব অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, তখন তারা কার্যত বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধকে রক্ষা করে। হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় এড়াতে এই আশ্রয় একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে। ভারত জানে, এই অপরাধীদের ফেরত না দিলে বাংলাদেশে সত্যিকারের বিচার শুরু হবে না, ইতিহাসের দায় নির্ধারিত হবে, আর সেই দায়ের একাংশ তাদের ওপরও পড়বে। তাই তারা কৌশলে বিচারবিহীনতার দেয়াল তুলে রেখেছে। এটি কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণ নয়; এটি জনগণের ন্যায্য অধিকার, বিচার এবং মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত অবস্থান। যে রাষ্ট্র খুনি ও গণহত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র নিজেই নৈতিকভাবে সেই অপরাধের অংশীদার হয়ে যায় এই বাস্তবতা আজ আর লুকানোর কিছু নেই।

বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কখনোই স্বচ্ছ, সমানুভূতিশীল বা সম্মানজনক হয়নি, কারণ ভারত কখনোই সাধারণ জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়নি; বরং তারা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন একটি দল এবং একজন স্বৈরাচারী শাসকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। এই সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করা, স্বাধীন নীতি গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সুবিধা নিশ্চিত করা। ভারতের কৌশল ছিল হাসিনার আওয়ামী লীগকে তাদের আঞ্চলিক নীতির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির অন্যায্য বণ্টন, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার ফাঁদ তৈরি, এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এই সমস্ত কৌশল হাসিনার সরকার বিনা প্রশ্নে অনুসরণ করেছে, যা দেখিয়েছে ভারতের স্বার্থেই গণতন্ত্রকে পিছুটান দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন ও স্বশৃঙ্খল হওয়ার পরিবর্তে কার্যত একটি অনুগত প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারের রূপ নিয়েছে। জনগণের স্বাভাবিক অধিকার, ভোটাধিকার, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বারবার সীমিত করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতের প্রতি কোনো বন্ধুত্ব বা আস্থা দেখাতে পারছে না; বরং তারা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে দেখছে, যা স্বৈরাচারী শাসককে রক্ষা করে দেশের জনগণের ভবিষ্যতকে জিম্মি করেছে। ভারতের এই নীতি কেবল বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অনিশ্চিত করেছে। জনগণ ও স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যখন তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে, তখন ভারতের নীতি সরাসরি তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ওপর দাঁড়িয়ে নয়, বরং ক্ষমতা ও দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করা সম্পর্ক কখনোই টেকসই হয় না। এই ধরনের সম্পর্ক শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সূচনা করে, এবং সেই সংকটের জন্য দায়ী হয় সেই রাষ্ট্র, যা স্বৈরাচারকে বাঁচিয়ে রেখে জনগণের স্বাভাবিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে।

এই কারণেই আজ বাংলাদেশের জনগণ স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য যে, খুনি গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার শাসনযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের ভারতের আশ্রয় থেকে প্রত্যাহার না করা হলে ভারতের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না, এবং সেই সম্পর্ক হওয়া উচিতও নয়। সম্পর্ক কোনো কাগুজে কূটনৈতিক শব্দ নয়, এটি শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা বিবৃতির বিষয়ও নয়; সম্পর্ক গড়ে ওঠে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং জনগণের মর্যাদার ওপর। যে রাষ্ট্র বাংলাদেশের মাটিতে রক্ত ঝরানো অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়, যে রাষ্ট্র বিচারপ্রক্রিয়াকে অবজ্ঞা করে খুনি ও সন্ত্রাসীদের রক্ষা করে, সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে “স্বাভাবিক সম্পর্ক” দাবি করা আসলে জাতিগত আত্মসম্মান বিসর্জনের শামিল। এটি কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিকভাবে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ভারতের সামনে আজ স্পষ্টভাবে দুটি পথ খোলা আছে। একটি পথ হলো, স্বৈরাচার ও অপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রাখা, নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারকে পদদলিত করা। অন্য পথটি হলো, জনগণের ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সঠিক পাশে অবস্থান নেওয়া, যা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতের নিজের দীর্ঘমেয়াদি সম্মান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে রাষ্ট্র অন্য দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে সহায়তা করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষয় করে ফেলে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর ভারত কি জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি অপরাধীদের রক্ষা করে নিজের ভূমিকার জন্য ইতিহাসে অভিযুক্ত হবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু কূটনীতির নয়, এটি ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝের এক গভীর বিভাজনের সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করবে।