CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান একটি ফ্যাসিবাদী দলিল

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান আসলে কোনো গণতান্ত্রিক দলিল নয়। এটি এক দলীয় শাসন ও রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের নীতিগত ভিত্তি। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান আজ জনগণের চেয়ে একজন ব্যক্তিকে এবং একটি দলকে শক্তিশালী করার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সংবিধান এখন এমন এক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সরকারপ্রধান নিজেকে বিচার, আইন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এই সংবিধান এখন একটি ফ্যাসিবাদী দলিল, যা সরকার প্রধানকে একনায়ক ও স্বৈরাচারী ক্ষমতা দিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন ও দমন করার পথ প্রশস্ত করেছে। এই সংবিধানের ধারা ও সংশোধনীগুলো এমনভাবে গৃহীত হয়েছে, যা স্বৈরশাসক শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেয় এবং প্রতিনিয়ত আমাদের গণতন্ত্রের চেতনা ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

১৯৭২ সালের সংবিধান, আজ অনেক সংশোধনের মাধ্যমে বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারা বাতিল করে এককদলীয় শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। এর ফলে বিরোধী দলগুলোকে নিপীড়নের মাধ্যমে ভোটাধিকার খর্ব করা হয়েছে, যা গণতন্ত্রের প্রতি বিরাট ব্যাঘাত। সরকার প্রধানের হাতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নস্যাৎ করা হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের একতরফা আধিপত্যের কারণে বিচার ব্যবস্থা আজ সরকারের পোষা কুকুরে পরিণত হয়েছে। এতে বিচারিক নিরপেক্ষতা হারিয়ে সমাজে অবিচার ও দুর্নীতির পরিসর বাড়ছে।

বাকস্বাধীনতা, সমাবেশ ও মত প্রকাশের অধিকার -এসব মৌলিক অধিকার আজ দেশে কার্যত ভাসমান। নানা আইনের জাল বুনে বিরোধী মত দমনের প্রচেষ্টা চলছে। আজ আমরা সাংবাদিক, ব্লগার, এবং সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারি না, কারণ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি, গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়। নিজের মত প্রকাশ করার কারনে অনেকে তো গুম, খুন ও অপহরণও হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এখন আর স্বাধীন কিংবা নিরপেক্ষ নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতায় রাখার একটি হাতিয়ার মাত্র। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই সরকার বিরোধীদের দমন, ভোটারদের হয়রানি ও নির্বাচনী দুর্নীতির জবাবদিহিতাহীনতার নজির গড়ে উঠেছে। এতে জনগণের ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ ও হরণ হচ্ছে।

বর্তমান সংবিধান ও আইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার প্রধান যেন একনায়ক হয়ে উঠেছেন, যিনি নিজের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সবকিছুর বিরুদ্ধে নির্লজ্জ ভাবে আইন প্রয়োগ করেন। এতে বাংলাদেশের সংবিধান এক ফ্যাসিবাদী দলিলের রূপ গ্রহণ করেছে, যা গণতন্ত্রের শিকড় নষ্ট করেছে এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা হারিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের ভাববার সময় এসেছে -একটি সংবিধান, যা হওয়া উচিত ছিল স্বাধীনতার প্রতীক, আজ যদি সেটি শাসকের ক্ষমতা সুরক্ষার অস্ত্রে পরিণত হয়, তবে সেটি জনগণের দলিল নয়, বরং শাসকের দমননীতি প্রতিষ্ঠার ফ্যাসিবাদী চুক্তিপত্র। সত্যিকারের গণতন্ত্র সুষ্ঠু নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতায় নিহিত। যদি সংবিধান এই সব মৌলিক কাঠামোকে উপেক্ষা করে, তবে আমাদের প্রশ্ন তুলতেই হবে -এই সংবিধান কার জন্য? জনগণের জন্য, না একদল ক্ষমতালোভীর জন্য?