CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

জামায়াতে ইসলামী কেন দেরিতে নির্বাচন চায়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী একটি চিহ্নিত নাম—কেউ বলেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতীক, কেউ বলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে দগ্ধ এক বিতর্কিত দল। যে দল এক সময় ধর্মের নামে গণতন্ত্রকে কবর দিতে চেয়েছিল, আজ তারা আবারও একটি পরিচিত কৌশলে মাঠে নেমেছে—নির্বাচন চাই, তবে এখনই না। প্রশ্ন উঠেছে: এই বিলম্বের দাবির পেছনে আসলে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে? তারা কি সত্যিই গণতন্ত্র চায়? নাকি সময় নিচ্ছে পুরনো মুখে নতুন রঙ মেখে ফিরে আসার জন্য?

জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস কখনোই গণতন্ত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। ১৯৭১ সালে তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। তাদের ছাত্রসংগঠন আল-বদর মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল, যাদের হাতে প্রাণ গেছে দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ১৯৭৯ সালে সামরিক শাসনের ছায়ায় তারা ফের রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসে। কিন্তু তারা কখনোই দেশের অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে সম্মান করেনি, বরং রাজনীতিকে ধর্মীয় উগ্রতায় চালিত করে একটি বিভাজিত সমাজ তৈরির পাঁয়তারা করেছে। আজ যখন দেশের মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে, তখন জামায়াত চায় আরও সময়। তারা নির্বাচনের কথা বলে, কিন্তু শীগগির নির্বাচন চায় না— জামায়াত জানে, আজ যদি নির্বাচন হয়, তাহলে তারা হারবে। তাদের হাতে এখন নেতৃত্ব নেই, জনভিত্তি নেই, আদর্শ নেই—শুধু আছে এক চিরচেনা কৌশল: সাম্প্রদায়িকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।

বর্তমান বিশ্বে সাম্প্রদায়িক উগ্রতার বিরুদ্ধে প্রবল জনমত রয়েছে। জামায়াত তাই এখন নরম ভাষা, গণতন্ত্রের বুলি ও মানবাধিকারের মুখোশ পরে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে। তারা চায়: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের নিরীহ প্রমাণ করতে, দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সহনশীলতার কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াতে, যুদ্ধাপরাধ নিয়ে জনগণের স্মৃতি মুছে ফেলতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একই জামায়াত, শুধু পোশাক বদলালে কি চরিত্র বদলায়? জামায়াত আজ নিজেদের গুছিয়ে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে— কিন্তু আদর্শ সেই একই: নারী বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা, বিচারবহির্ভূত সমাজতন্ত্র, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অবস্থান।

জামায়াত জানে, তারা জনগণের হৃদয়ে নেই। যুদ্ধাপরাধের দায়, কট্টরপন্থী রাজনীতির ইতিহাস, নারী বিদ্বেষ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান—এই সব কিছু মিলে তারা আজ গণবিচ্ছিন্ন। যদি এখনই নির্বাচন হয়, তাহলে জনসমর্থনের ভয়াবহ অভাব স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর তাই তারা চায় সময়—তাদের পুরনো কৌশল ‘সংগঠিত হও, সাম্প্রদায়িকতার নামে বিভ্রান্ত কর, তারপর ভোট চাও’। জনগণ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এখন সময়, তাদের সকল নাটক উন্মোচন করে স্পষ্টভাবে বলা: জামায়াতের জায়গা রাজনীতিতে নয়, ইতিহাসের আসামির কাঠগড়ায়। নির্বাচনের যত দেরি হবে, ততই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে—এটাই জামায়াতের লাভ। তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব মূলত নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তির উপর দাঁড়িয়ে। তারা কখনোই স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে শক্তিশালী হতে পারে না। ফলে তারা সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে সেটা নিজেদের পক্ষে নেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।