বাংলাদেশের রাজনীতি এক জটিল আবর্তন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে—ক্ষমতায় থাকা দল যেমন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তেমনি বিরোধী দলে থাকা দলগুলো গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নিজেদের অতীত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করে। এই চিত্র বিএনপির ক্ষেত্রেও সত্য। বর্তমানে বিএনপি নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করলেও প্রশ্ন একটাই: যদি তারা আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা কি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে, না কি বাংলাদেশকে ঠেলে দেবে আরেকটি ভয়াবহ স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট শাসন আমলের দিকে?
১৯৯১ সালে সামরিক সরকারের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তখন জনগণের আশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিএনপির শাসনামলেই দেখা গেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব, নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন, সাংবাদিক হত্যা ও গুম, এবং সর্বোপরি দুর্নীতির জগদ্দল পাথর। বিশ্বব্যাংক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা বিএনপির শাসনামলকে দুর্নীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বিএনপি সরকার বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। একে একে বিচারপতিদের বাধ্য করে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছে, যে কারণে সেই সময় সংবিধানকে দলীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছিল। এই ধারা যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে কি তাকে গণতন্ত্র বলা যায়?
২০০৪ সালে বিএনপি সরকার ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)’ গঠন করে। যদিও শুরুতে এটিকে একটি অপরাধবিরোধী বাহিনী বলা হয়েছিল, বাস্তবে এটি হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক অপারেশনের বাহিনী। অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, এবং ধরপাকড়ের ঘটনায় র্যাব জড়িত ছিল। বিএনপি আজ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে র্যাব ব্যবহারের অভিযোগ করলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, র্যাবের জন্ম এবং প্রথম দমন-নির্যাতন শুরু হয়েছিল বিএনপির সময়েই। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বিএনপির প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনোই গণতান্ত্রিক ছিল না।
আজ বিএনপির নেতৃত্বে আছেন তারেক রহমান, যিনি একাধিক দুর্নীতির মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি। তিনি লন্ডনে বসে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সভা-সমাবেশ, সিদ্ধান্ত সবই সেখান থেকে পরিচালিত হচ্ছে। কোন গণতান্ত্রিক দল এমন একজন দণ্ডিত, পলাতক, অগণতান্ত্রিক ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে দেখতে চায়? তারেক রহমানের অতীত বলছে, তিনি রাজনৈতিক প্রতিশোধ, অর্থলিপ্সা ও গোপন ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক। তিনি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, গুম, হত্যা, আর অপারদর্শিতা নতুন মাত্রা পাবে। তার নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো কল্পনা করাই অসম্ভব।
বিএনপি বারবার বিদেশিদের কাছে “নিরপেক্ষ নির্বাচন” চাইছে। কিন্তু দলটির নিজেদের ভিতরে নেই গণতন্ত্র। দলের প্রতিটি স্তরে আদেশ-নির্দেশ একচেটিয়া, বিতর্ক সহ্য হয় না, ভিন্নমত দমন করা হয়। এমনকি দলের বহু ত্যাগী নেতা নেত্রীর সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে দল ত্যাগ করেছেন বা নীরব হয়ে গেছেন। বিএনপি দলের ভেতরেই যদি গণতন্ত্র না থাকতে পারে, তাহলে তারা জাতির জন্য কেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে? বিএনপি আজ নিজেদের “নতুন রাজনৈতিক শক্তি” হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এতগুলো বছর পরও কেন তারা তারেক রহমানের বিকল্প খুঁজে পেল না?কেন এত বছরের রাজনীতির পরও নীতি, আদর্শ, নেতৃত্ব—সবই ভোঁতা? কারণ একটাই—বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। এখন তারা কেবল “ক্ষমতা” চায়, উদ্দেশ্য “পরিবর্তন” নয়। বাংলাদেশের জনগণ চায় সত্যিকারের গণতন্ত্র, আদর্শনিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি যদি আবার সেই পুরোনো পথ ধরে, তাহলে আগামী দিনের স্বৈরতন্ত্র হবে আরও ভয়াবহ, আরও দুর্বিষহ।
