আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন সুশাসন ও জবাবদিহিতা চরম সংকটে, তখন কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা প্রকাশ করল একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন- “All the Prime Minister’s Men”। এই রিপোর্টে বাংলাদেশের বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের নানা অপরাধ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র কিভাবে একটি সন্ত্রাসী মাফিয়া পরিবারের হাতের খেলনায় পরিণত হয়, তার নির্মম বাস্তবচিত্র এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। এবং ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়েই এসব অনিয়ম ও অপরাধ ঘটেছে।
সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারকে কেবল অপরাধী পরিবার বলা যাবে না। এরা একটি সন্ত্রাসী মাফিয়া পরিবার, যাদের রাজনৈতিক আশীর্বাদ এবং সামরিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা হয়েছে। এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, অস্ত্র ব্যবসা, জালিয়াতি, বিদেশে পলায়ন, এবং ভুয়া পরিচয়পত্র বানিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অপরাধের তালিকা। তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কোনো একক ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্য থেকেই পরিচালিত অপরাধ চক্র।
সেনাপ্রধান আজিজ আহমদের ভাইয়েরা- আনিস আহমেদ, হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ -২০০৪ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় আদালতে দণ্ডিত হয়েছিল। হারিস ও আনিস ছিলেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, আর জোসেফকে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। অথচ এই তিনভাই সেনাপ্রধান আজিজের রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সিঁড়ি ব্যাবহার করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। কোনো এক দুর্নীতিপরায়ণ, বিচারবিমুখ রাষ্ট্রেই এটা সম্ভব যে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আবার রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা পায়।
আল-জাজিরার এক ঘণ্টাব্যাপী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভিডিও ফুটেজ, গোপন ফোনালাপ, সরকারি নথি ও ভুয়া পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রমাণ দেখানো হয়- জেনারেল আজিজ আহমদ নিজেই তার সাজাপ্রাপ্ত ভাইদের রক্ষা করছেন, বিদেশে পলায়নে সহায়তা করছেন এবং এমনকি তাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্র চুক্তির ব্যবসায় জড়ানোর পথ করে দিচ্ছেন। হারিস আহমেদ ইউরোপে ‘মোহাম্মদ হাসান’ নামে আত্মপরিচয় গোপন করে ব্যবসা করছে এবং রাষ্ট্রীয় চুক্তির পেছনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একথা বিশ্বাস করতেও দু:খ হয় যে, খুনিরা রাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত হতে পারে। আর সেটাও সেনাপ্রধান আজিজ আহমদের ছত্রছায়ায়।
এই পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক। আল-জাজিরার তথ্য মতে, সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ বর্তমান স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক। তিনি শুধু সামরিক দায়িত্ব পালনরত সেনাপ্রধান নয়, বরং রাজনৈতিক দমন-পীড়নে সরকারের ‘বিশ্বস্ত যোদ্ধা’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিলেন/হচ্ছেন। তাই তার অপরাধ ঢাকার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে। এই কারণেই এত বড় অপরাধের পরেও আজিজ আহমেদ তার পদে বহাল আছেন এবং ভাইদের রাষ্ট্রীয় রক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আরও ভয়ের বিষয় হলো, এই পরিবার কেবল অপরাধ করেছে না- তারা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের অপরাধ আড়াল করার কাজে ব্যবহার করেছে। কূটনৈতিক পাসপোর্ট, জালিয়াতি, অস্ত্র ব্যবসা, বিদেশে টাকা পাচার, খুন- সবকিছুর পেছনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছিল স্পষ্ট। এটা প্রমাণ করে, বাংলাদেশে এখন আর আইনের শাসন নেই। আছে রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক বিচারহীনতা। সেনাপ্রধানের পরিবারের সন্ত্রাসী মাফিয়া ভাইদের জন্য সংবিধান, আইন একরকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেকরকম।
এই ধরনের অপরাধ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভেতর থেকেই পরিচালিত হয়, তখন তা কেবল একটি পরিবার বা কয়েকজন ব্যক্তির সমস্যা নয়- এটি গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পচনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবার রাষ্ট্রের ভেতরে একটি ‘প্যারালাল পাওয়ার’ তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে বিচার, প্রশাসন ও নিরাপত্তা এখন তাদের হাতের মুঠোয়। এটাই তো সন্ত্রাসী মাফিয়ার আসল চেহারা- যেখানে তারা কেবল অস্ত্রধারী নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার রিমোট কন্ট্রোল নিজের হাতে রেখে জনগণকে জিম্মি করে।
এই প্রতিবেদন প্রচারের পর সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো স্বতন্ত্র তদন্ত না করে বরং আল-জাজিরাকে আক্রমণ করে, রিপোর্টটিকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে বাতিল করে দেয়। কোনো দায় স্বীকার করা তো দূরের কথা, বরং গণমাধ্যম ও বিরোধী মতকে দমন করাই ছিল সরকারের একমাত্র প্রতিক্রিয়া। এর থেকেই বোঝা যায়, এই সরকার কেবল অপরাধীদের রক্ষা করছে না, বরং অপরাধীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।
আজ বাংলাদেশের মানুষ বিচার চায় না, কারণ তারা জানে- এই রাষ্ট্রে বিচার হয় না। যে রাষ্ট্রে খুনিরা প্রধানমন্ত্রীর লোক হয়, সেখানে নিরপরাধ মানুষের জন্য কোনো আদালত নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু অন্যায় ভুলে না। সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার মাফিয়া ভাইদের বিচার একদিন বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=a6v_levbUN4&t=979s
ছবিঃ আল-জাজিরা
