বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল (অ্যালফাবেট) তাদের ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্বেগজনক আচরণ কিভাবে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের প্রশ্ন তোলার অধিকারকে সরাসরি আঘাত করছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশ সরকার ২৭৯টি কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ পাঠিয়েছে, এবং এসব অনুরোধের আওতায় অপসারণের আইটেম সংখ্যা ছিল ১,০২৩টি। বাস্তবে এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয় এগুলো এক অসুস্থ মানসিকতা, এক রাষ্ট্রীয় মনোভাবের প্রতিচ্ছবি; যেখানে সরকার সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, প্রশ্ন তুললেই সেটিকে “হুমকি” ও “অপরাধ” বানিয়ে দিতে চায়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছিল মুক্তি, স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তবে তারা যা করেছে, তা পূর্ববর্তী দমনমূলক শাসনেরই নতুন সংস্করণ। এ যেন ফ্যাসিবাদের চাদর পরে গণতন্ত্রের মুখোশ মুক্তির নামে দমন, স্বচ্ছতার নামে সেন্সরশিপ, আর মানবাধিকারের নামে গোপনীয় নজরদারি। সরকার যখন গুগলের কাছে সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে ২৭৯টি অনুরোধ পাঠায়, তখন তা শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগ নয়, বরং সরাসরি জনগণের ওপর আরোপিত রাষ্ট্রীয় ভীতি প্রদর্শন।
বাংলাদেশ এমন এক রাজনৈতিক সময়ে আছে, যখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল ক্ষতবিক্ষত গণতন্ত্রকে পুনর্গঠন করা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙা, মুক্তবাকের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। কিন্তু অন্তবর্তী সরকার বরং বিপরীত পথ নিয়েছে সমালোচনা মুছে ফেলার পথ, অস্বস্তিকর সত্যকে গোপন করার পথ, নিজের অপারগতা আড়াল করার পথ। গণতান্ত্রিক সরকার বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ সরকার কখনোই এই পথে হাঁটে না। যারা জনমত শুনতে চায়, তারা সমালোচনাকে ভয় পায় না; যারা সত্যের শক্তিতে বিশ্বাস করে, তারা ভিন্নমত সেন্সর করে না; যারা দেশের মানুষকে সশস্ত্র প্রতিপক্ষ মনে করে না, তারা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের দরজায় গিয়ে “আমাদের বিরুদ্ধে লেখা মুছে ফেলুন” এই ধরনের শিশুসুলভ আচরণ করে না। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অন্তবর্তী সরকার নিজেদের বিরুদ্ধে লেখা, তদন্তমূলক তথ্য, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা এসবকে “অস্বস্তিকর কনটেন্ট” হিসেবে দেখছে। এর মানে, তারা এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো চাইছে যেখানে মানুষ শুধু সরকারের প্রশংসা করবে, সরকারের ভুল তুলে ধরবে না, সরকারের ব্যর্থতার কথা বলবে না। এটি নিঃসন্দেহে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস বলে যেখানে বাকস্বাধীনতা দমন করা হয়, সেখানে ন্যায়বিচার অদৃশ্য হয়ে যায়; যেখানে ভিন্নমতকে অপরাধ করা হয়, সেখানে রাষ্ট্র জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়; যেখানে সমালোচনার জায়গা থাকে না, সেখানে ক্ষমতা দুর্নীতিকে জন্ম দেয়, আর দুর্নীতি জন্ম দেয় দমনকে।
অন্তবর্তী সরকারের উচিত ছিল মানুষের কণ্ঠস্বরকে রক্ষা করা কারণ এরাই তো নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু তারা বরং শাসনক্ষমতার সুবিধা নিয়ে সমালোচকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। প্রশ্ন হলো: একটি অন্তবর্তী সরকার কেন সমালোচনা নিয়ে এত ভয় পায়? কেন তাদের বিরুদ্ধে লেখা ১ হাজারের বেশি কনটেন্ট মুছে ফেলতে তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এত মরিয়া হয়ে অনুরোধ করতে বাধ্য হয়? সত্যিটা হলো তারা জানে, জনগণের চোখের সামনে যে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, তা তারা লুকাতে পারবে না। মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থার পক্ষপাত, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এসব বিষয় জনগণ দেখছে, লিখছে, বিশ্লেষণ করছে। তাই তারা সত্যের বিরুদ্ধে তথ্য নিয়ন্ত্রণের ঢাল তুলছে। সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো এই সেন্সরশিপ প্রবণতা দেখিয়ে অন্তবর্তী সরকার প্রমাণ করেছে তারা পূর্ববর্তী শাসনের মতোই ক্ষমতা-সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সমালোচক, সাংবাদিক, ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট এদের লেখা মুছে ফেলানোর চেষ্টা করে তারা বারবার একই বার্তা দিয়েছে: “আমরা সমালোচনা সহ্য করি না, আমরা প্রশ্ন সহ্য করি না।” অথচ রাষ্ট্রশক্তির আসল পরিমাপ সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতায়; যে সরকার ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল নয়, তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের এই পদক্ষেপ শুধু বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত নয় এটি ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়। আজ কনটেন্ট মুছে ফেলার আবেদন, কাল সমালোচকদের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানি, পরশু সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এই পথটাই সাধারণত ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের পথচলা। আন্তর্জাতিক মহল, মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগের চোখে দেখছে, কারণ একটি রাষ্ট্র যখন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর সেন্সরশিপ চাপায়, তখন সেটা নাগরিক অধিকার হরণের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুসংগঠিত রূপ। এখন সময় এসেছে অন্তবর্তী সরকারের দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছোড়ার: জনগণের সমালোচনা কি এতটাই ভয়ংকর? সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস কি আপনাদের নেই? যদি গণতন্ত্র ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে কেন জনগণের কণ্ঠরোধ করছেন? একদিনের জন্য হলেও যদি জনগণের কথা শোনার মানসিকতা থাকে, তাহলে সেন্সরশিপ নয়—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় আপনারা যে “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা”র গল্প শোনাচ্ছেন, তা জনগণের কাছে একচেটিয়া প্রশাসনিক ভণ্ডামি ছাড়া কিছুই নয়।
বাংলাদেশের মানুষ সেন্সরশিপ চায় না, দমন-পীড়ন চায় না, গলা চেপে ধরা শাসন চায় না। তারা চায় সত্য, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, এবং সেই স্বাধীনতা যা রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না। গুগলের রিপোর্ট সেই চরম সত্যটিই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে সরকার নিজেদের সমালোচনা মুছে ফেলতে ব্যস্ত, সেই সরকার জনগণের নয়, বরং নিজের ক্ষমতার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত। এটাই অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রকৃত চেহারা গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতিতে ক্ষমতায় এসে আবারও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হানা, সত্যকে দমন করা, এবং জনগণের কণ্ঠকে ভয় পাওয়া। আর একটি সরকার যখন জনগণের কণ্ঠস্বরকে ভয় পেতে শুরু করে, তখন সেদেশে গণতন্ত্র থাকে না থাকে কেবল ফ্যাসিবাদের ট্র্যাজেডি।
