বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল কার্যত একই মুদ্রার এপিট ওপিট, নাম ভিন্ন কিন্তু চরিত্র এক। উভয় সংগঠনই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কলেজ, ইউনিভার্সিটির ভেতরে ও বাইরে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের দলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং ছাত্রদল বিএনপির ছায়ায় একই কায়দায় রাজনীতি পরিচালনা করে কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে হল দখল, ভর্তি বাণিজ্য, দোকান-হোস্টেল থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, ঠিকাদারি ও টেন্ডার প্রভাবিত করা, ভিন্নমত দমন করা, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও জিম্মি করে রাখা এসব কর্মকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। এই দুই সংগঠন ছাত্রসমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অপরাধ ও অর্থনীতির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ফলে কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ে, শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে থাকে, আর রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতে তুলে দেয়। এই বাস্তবতায় ছাত্রদলকে ছাত্রলীগের বিকল্প কোনো “পরিষ্কার সংগঠন” হিসেবে তুলে ধরা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। বরং তারা একই রাজনৈতিক ডিএনএ বহন করে, ক্ষমতা পেলেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নির্যাতন, দখল, টাকা, ভয় ও প্রভাব। এই সন্ত্রাসী উগ্র সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য মৌলিক হুমকি, কারণ তারা নাগরিক রাজনীতিকে অপরাধভিত্তিক রাজনীতিতে রূপান্তর করে, যেখানে আদর্শ নয়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসই ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী মাসের নির্বাচনের পর বিএনপির সংসদে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করার দাবি কোনো দলীয় দাবী নয়; এটি রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্ন। বিএনপির ছাত্রসংগঠন সন্ত্রাসী ছাত্রদল বছরের পর বছর ধরে যেভাবে ছাত্র-ছাত্র-ছাত্রীদের নির্যাতন, চাঁদাবাজি, হামলা, মামলা বাণিজ্য, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও দখলদারিত্ব চালিয়েছে, তা যদি কোনো গণতান্ত্রিক দলের ছাত্রসংগঠনের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তবে তারা বহু আগেই অযোগ্য ঘোষিত হতো। ক্যাম্পাসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালেই ছাত্রদলের পুরনো প্যাটার্ন ফিরে আসে, অর্থ আদায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে চাপে রাখা, স্থানীয় ব্যবসা ও পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ছাত্রদল কেবল ছাত্রসমাজ নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও প্রশাসনকেও প্রভাবিত করে। এই সংগঠন বিএনপির রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যেখানে মাঠের কর্মী মানেই চাঁদাবাজি ও প্রভাবের বাহিনী। বিএনপির নেতৃত্ব এই বাস্তবতা জানে, তবু তারা কোনো কার্যকর সংস্কার করে না, কারণ এই অবৈধ নেটওয়ার্কই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান শক্তি। সুতরাং এমন একটি দলের সংসদে প্রবেশ মানে আইনপ্রণয়নের ভেতরে চাঁদাবাজদের সন্ত্রাসীদের প্রবেশ, নীতি নির্ধারণে সন্ত্রাসীদের প্রভাব, আর রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতির বৈধতা প্রতিষ্ঠা। একটি রাষ্ট্র যখন এই পথে হাঁটে, তখন গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে থাকে সিন্ডিকেটের শাসন।
যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে সন্ত্রাসী ছাত্রদলকে কেন্দ্র করে দেশ দ্রুত দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কেবল অনুমান নয়; এটি ইতিহাসভিত্তিক আশঙ্কা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বিএনপির শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে অপরাধী নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়, রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবৈধ অর্থনীতি বিস্তৃত হয়, বিচার ও প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। ছাত্রদল তখন কেবল ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা পরিবহন, ঠিকাদারি, জমি, বাণিজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে আর নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না, দেখে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত কাঠামো হিসেবে। এতে বিনিয়োগ নষ্ট হয়, শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়, মেধা দেশ ছাড়ে, এবং সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা স্থায়ী রূপ নেয়। গণতন্ত্র তখন ভোটের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু নাগরিকের গনতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা হারিয়ে যায়। এই ভবিষ্যৎ রোধ করাই আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব। তাই ভোটারদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট যে, বিএনপি ছাত্রদলের মতো চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সংগঠনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, সেই দলকে ভোট দেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার হাতে তুলে দেওয়া।
এই বাস্তবতায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তায়, নির্বাচনের আগে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলকে আওয়ামীলীগের ছাত্রলীগের মতোই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষনা দিয়ে নিষিদ্ধ করে তাদের সহিংসতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র সুরক্ষার প্রশ্ন। যদি একটি সংগঠন নিয়মিতভাবে আইন ভাঙে, শিক্ষাঙ্গনকে অপরাধের ঘাঁটিতে পরিণত করে, নাগরিকদের ভয় দেখায় ও অর্থ আদায় করে, তবে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তাদের দায়মুক্তি দিতে পারে না। নির্বাচনের আগে এই সংস্কার না হলে আগামী সংসদও সেই পুরনো সিন্ডিকেটের দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক মাঠকে অপরাধমুক্ত করতে হবে, আর সেই পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল উভয়ের সহিংস ও অবৈধ কাঠামোর বিরুদ্ধে সমানভাবে কঠোর হওয়া। ভোটারদের দায়িত্ব হলো এই বাস্তবতা বোঝা এবং ব্যালটের মাধ্যমে বিএনপির দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু সরকার দিয়ে নয়, জনগণের নৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে।
