সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে ভয়াবহ কিছু প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ECB চত্বরে তার স্টুডিওতে হামলার পর সালমান অভিযোগ করেছিলেন, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই তার প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে এবং তিনি বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার এই অভিযোগ প্রকাশিত হলেও পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পরে বলেছে প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটির সঙ্গে একটি জমি বিরোধের সম্পর্ক পাওয়া গেছে এবং চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তৈরি হয় একজন নাগরিক যদি প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি সরকারের দায়িত্ব নয়? অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্ত করে আদালত ও আইন নির্ধারণ করবে। কিন্তু কোনো অভিযোগের জবাব যদি রাজনৈতিক চাপ, ভয় দেখানো, সামাজিক হেনস্তা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা। বিএনপি যদি সত্যিই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত না থাকে, তাহলে তাদের উচিত আইনি তদন্তকে স্বাগত জানানো এবং অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করা, সমালোচকের কণ্ঠ বন্ধ করার পরিবেশ তৈরি করা নয়। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে তার দায়িত্ব বিরোধী মতকে ভয় দেখানো নয়, বরং নিজের আচরণ দিয়ে প্রমাণ করা যে জনগণ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে।
Tag: ছাত্রদল
বিএনপি আর আওয়ামী লীগের যেখানে মিল: দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও চাঁদাবাজির রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে অনেক সময় পরস্পরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে দেখলে, ক্ষমতার রাজনীতির কিছু মৌলিক চরিত্রে তাদের মধ্যে অস্বস্তিকর মিল রয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিন্নমতকে চাপ দেওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসব বিষয় দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি একই ধরনের অভিযোগ ছাত্রদল বা অন্য কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে, তাহলে শুধু সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। আমার কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যে রাজনীতির বিরুদ্ধে বিএনপি একসময় জনগণের সমর্থন চেয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই একই ধরনের আচরণের অভিযোগ যদি তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে পরিবর্তনটা কোথায়? শুধু আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি বসানো যদি পরিবর্তনের অর্থ হয়, তাহলে সেটি কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কার নয়। জনগণ দল বদল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার চরিত্র বদল দেখতে চায়।
তারেক রহমান কি শেখ হাসিনার পথেই হাঁটছেন?
জনাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আপনাদের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল ক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। অথচ আজ আপনাদের সরকারের ক্ষেত্রেই যদি একই ধরনের প্রবণতার জন্ম নেয়, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে, পরিবর্তনটা আসলে কোথায়? ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর আচরণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি, চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আপনি ও আপনার দলের কাউকে নিয়ে কথা বললেই হামলা, মামলা নিয়ে অভিযোগ ও সমালোচনা উঠছে, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একজন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করা যাবে, তাঁর নীতির প্রশংসা করা যাবে, কিন্তু তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। আরও হতাশার বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে এসব অভিযোগের পরও আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট কঠোর ও স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা জনগণের সামনে আসছে না। আপনার নীরবতা যদি সম্মতি না-ও হয়, তবুও সেটি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে। আপনি কি সত্যিই চান আপনার চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হোক, যেখানে আপনার সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে? যদি না চান, তাহলে এখনই স্পষ্ট করুন প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁর দলের কোনো নেতাকর্মীও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গেছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রশাসনের প্রকাশ্য ও ক্রমবর্ধমান পক্ষপাতিত্ব, যা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয় বরং জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক পদে থাকা কর্মকর্তাদের আচরণে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিনিধি না হয়ে বিএনপির প্রতি একধরনের অস্বাভাবিক আনুগত্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন করছে। যাস্ট কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি বিএনপির নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রদলের ক্যাডাররা লাটি ও অস্র নিয়ে হাটছে, তাদের হাতে লাটি, অস্র থাকার পরও পুলিশ ছাত্রদলের কাউকে গ্রেফতার করলো না, এটিই স্পষ্ট পক্ষপাতীত্বের প্রমান। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রশাসনের এই পক্ষপাতিত্বের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং মানবাধিকারের ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যখনই প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন নির্বাচন আর অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকে না; বরং ভোট কারচুপি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পাতানো নির্বাচনের পথ সুগম হয়। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিএনপিকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও বিরোধী মতের মানুষের জন্য সেই একই সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ভোটারদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং হতাশা সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের এমন একপক্ষীয় ভূমিকার কারণে দেশ আবারও অতীতের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে জনগণের মতামতের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পায়।
ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল মুদ্রার এপিট ওপিট: বাংলাদেশের দুই সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠন
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল কার্যত একই মুদ্রার এপিট ওপিট, নাম ভিন্ন কিন্তু চরিত্র এক। উভয় সংগঠনই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কলেজ, ইউনিভার্সিটির ভেতরে ও বাইরে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের দলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং ছাত্রদল বিএনপির ছায়ায় একই কায়দায় রাজনীতি পরিচালনা করে কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে হল দখল, ভর্তি বাণিজ্য, দোকান-হোস্টেল থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, ঠিকাদারি ও টেন্ডার প্রভাবিত করা, ভিন্নমত দমন করা, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও জিম্মি করে রাখা এসব কর্মকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। এই দুই সংগঠন ছাত্রসমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অপরাধ ও অর্থনীতির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ফলে কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ে, শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে থাকে, আর রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতে তুলে দেয়। এই বাস্তবতায় ছাত্রদলকে ছাত্রলীগের বিকল্প কোনো “পরিষ্কার সংগঠন” হিসেবে তুলে ধরা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। বরং তারা একই রাজনৈতিক ডিএনএ বহন করে, ক্ষমতা পেলেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নির্যাতন, দখল, টাকা, ভয় ও প্রভাব। এই সন্ত্রাসী উগ্র সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য মৌলিক হুমকি, কারণ তারা নাগরিক রাজনীতিকে অপরাধভিত্তিক রাজনীতিতে রূপান্তর করে, যেখানে আদর্শ নয়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসই ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে।
