CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

আওয়ামী লীগ, ভারত ও বিএনপি বেধেছে জোট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবারই প্রমাণিত হয়েছে যে কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেই শাসনের চরিত্র বদলায় না, যদি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন থাকে দুর্নীতি, বিদেশি নির্ভরতা এবং জনগণবিমুখ রাজনীতি। ইতিহাস আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, বিএনপি ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুর্নীতিতে টানা পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এবং এই বাস্তবতা কোনো প্রতিপক্ষের প্রচারণা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংস্থা (Transparency International) ও বৈশ্বিক সূচকে স্বীকৃত সত্য। পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্কজনক রেকর্ড বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে এবং এই ইতিহাস মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। আজ যারা বিএনপিকে নতুন করে “বিকল্প শক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, তারা সচেতনভাবেই এই অতীত আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখে বড় বড় কথা বলা একটি দল যদি নিজের অতীতের দায় স্বীকার না করে, প্রকাশ্যে অনুশোচনা না জানায় এবং কাঠামোগত সংস্কারের কোনো সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা হাজির না করে, তাহলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া মানে পুরোনো লুটপাট, দখলদারিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতেরই নতুন সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করা। বাস্তবতা হলো, জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনব্যবস্থার মৌলিক গণতান্ত্রিক পরিবর্তন চায়। কিন্তু বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস ও আচরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, তারা সেই পরিবর্তনের প্রতীক নয়, বরং ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত অতীতেরই পুনরাবৃত্তি।

এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া আরও ভয়াবহ সত্য হলো বিএনপি ও তারেক রহমানের তথাকথিত রাজনৈতিক বিজয় আদতে মোদি ও হাসিনার রাজনৈতিক বিজয়েরই একটি ধারাবাহিক রূপ। বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর শোনালেও বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত কখনোই বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে না; তারা সম্পর্ক গড়ে তোলে তাদের ভারতপ্রেমি দলের সঙ্গে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি যে দল ভারতের আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে, সীমান্ত হত্যা নিয়ে নীরব থাকবে, অসম ও জনগণবিরোধী চুক্তিতে আপস করবে, ভারতের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকে প্রশ্ন করবে না ভারতের সমর্থন সেদিকেই যাবে যেমনটা অগনতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামীলীগকে সমর্থন দিয়ে করেছিল। আওয়ামীলীগের একতরফা নির্বাচন, বিরোধী দল দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ভারতের কাছে বড় সমস্যা হয়নি। কারণ আওয়ামীলীগ ভারতের কৌশলগত অংশীদার। অন্যদিকে বিএনপিও ক্ষমতায় থাকাকালে পানি বণ্টন ও সীমান্তে হত্যা নিয়ে ভারতের ওপর কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করেনি। ভারত কখনোই বিএনপির শাসনামলে পানি ও সীমান্ত হত্যা প্রশ্নে বড় কোনো ছাড় দেয়নি। উভয় দলই ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যা ভারতের কৌশলগত জয়। ভারতের সাথে এই সমর্থন কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরবে, আবার কখনো কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে দেওয়া হয়। ফলে সরকার বদলালেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চরিত্র বদলায় না, বদলায় শুধু মুখ। এই বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে তাহলে বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব কোথায়? জনগণের ভোটাধিকার কোথায়? রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থই বা কার হাতে বন্দি? যদি নির্বাচন, সরকার ও ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় ভারতের স্বার্থের সমীকরণে, তাহলে গণতন্ত্র একটি ফাঁপা শব্দ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ উভয়ের রাজনীতিই যদি শেষ পর্যন্ত দিল্লির সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণের মুক্তি নয়, কেবল শাসকের মুখ বদলই ঘটবে।

খুনি ও গণহত্যাকারী হাসিনার শাসনামলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কীভাবে গুম, খুন, দুর্নীতি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ নিয়েছিল। আইন, সংবিধান ও মানবাধিকারের কোনো মূল্য তখন আর রাষ্ট্রের কাছে ছিল না; বরং ভয়, দমন ও নিপীড়নই ছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রধান কৌশল। এই দমননীতির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ, যা বহু আগেই তার ছাত্ররাজনীতির পরিচয় হারিয়েছে। এটি ছাত্রলীগ আজ আর কোনো আদর্শিক ছাত্রসংগঠন নয়; এটি কার্যত একটি সংগঠিত সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পাসে রক্তপাত, হলে দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভিন্নমত দমনে হামলা, খুন, গুম প্রায় প্রতিটি অপরাধের সঙ্গেই ছাত্রলীগের নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু এই বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে শুধু আওয়ামী লীগে থামলে সত্য আড়াল করা হবে। কারণ বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলও এই সন্ত্রাসী সংস্কৃতির বাইরে নয়। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে কেবল পতাকা বদলায়, কিন্তু লাঠি, চাপাতি, গুম, খুন, আগুন আর ভয় দেখানোর রাজনীতি একই থেকে যায়। দুই দলের ছাত্রসংগঠনই প্রমাণ করেছে তারা গণতন্ত্রের রক্ষক নয়, বরং ক্ষমতালোভী নেতৃত্বের পাহারাদার। এই সহিংস ছাত্ররাজনীতি আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নার্সারি, যেখানে ভবিষ্যতের দমন-পীড়নের নেতৃত্ব তৈরি করা হয়। যতদিন এই সন্ত্রাসী ছাত্রসংস্কৃতির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না হবে, ততদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্র কেবল কাগজেই বেঁচে থাকবে।

এই কারণেই আজ মূল প্রশ্নটি কোনো একক দলকে ঘিরে নয়, প্রশ্নটি পুরো ব্যবস্থাকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ভারতের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ত্রিমুখী সমীকরণে বারবার প্রতারিত হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। এক শাসকের পতনের পর আরেক শাসক আসে, মুখ বদলায়, স্লোগান বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। বিচারহীনতা থেকেই যায়, দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, বিদেশি বা ভারতের প্রভাব আরও গভীর হয়, আর সন্ত্রাসী সহিংস রাজনীতি নতুন নামে, নতুন ব্যানারে আবার মাথাচাড়া দেয়। এই চক্রের ভেতরে পড়ে জনগণ শুধু ভোট দেয়, কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত মালিক হতে পারে না। তাই এই সংকট থেকে বেরোতে হলে আবেগ নয়, দরকার সচেতন, সাহসী ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেই জায়গা থেকেই ১২ তারিখের গণভোট কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ। এটি বলার সুযোগ যে জনগণ আর দুই বড় দলের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিচারহীনতা ও ভারতের আনুগত্যের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে। ১২ তারিখের গণভোটে “হ্যাঁ” বলা মানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের ছাত্ররাজনীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, এক ব্যক্তি ও পারিবারিক রাজনীতিকে না বলা এবং ভারতনির্ভর ক্ষমতার খেলাকে প্রত্যাখ্যান করা। এটি কোনো দলের পক্ষে ভোট নয়; এটি জনগণের পক্ষে দেওয়া একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। কারণ এই দেশ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, কোনো বিদেশি শক্তির উপনিবেশও নয় এই দেশ জনগণের। তাই নিজের অধিকার, ভবিষ্যৎ ও সম্মানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিন।