CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

বিএনপি ও তারেক রহমানের সহিংসতার রাজনীতি

বাংলাদেশ কি সত্যিই পেল একটি সন্ত্রাসী, শাসনধারী সরকারের অধীনে জীবনযাপন করার সুযোগ? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী দুই দিন বিএনপি ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের যে সহিংসতার বিস্তার ঘটেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মৌলিক কাঠামোর জন্য একধরনের অগ্নিপরীক্ষা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠেছে নির্বাচনের মাত্র দুইদিনের মধ্যে প্রায় ২১০টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ৫৩ শতাংশ শারীরিক হামলা, ১৪ শতাংশ বাড়িঘর, অফিস ও চেম্বারে ভাঙচুর, ১৩ শতাংশ হুমকি, ১০ শতাংশ অগ্নিসংযোগ এবং ১০ শতাংশ অন্যান্য সহিংসতা। হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধও ঘটেছে, যা একথা প্রমাণ করে যে, ভোটের নামধারণে বিএনপি দেশের নিরাপত্তা, শান্তি এবং সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রাকে হত্যা ও আতঙ্কের হুমকির মধ্যে ফেলে রেখেছে। এই সমস্ত নৃশংস কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতাদের পরিকল্পিত ও প্ররোচিত সহিংসতা। সাধারণ মানুষ ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা করে, কিন্তু বিএনপি-শাসিত সহিংসতা তা শূন্যে পরিণত করেছে। একটি নির্বাচন যদি গণতন্ত্রের উৎসবের বদলে রক্তপাত, প্রতিহিংসা এবং হিংস্রতার মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে এর দায় কে নেবে? এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল শুধু দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নষ্ট করে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। বিএনপির এই রাজনৈতিক শাসন কি জনগণের স্বার্থে, নাকি শুধুই নিজদের ক্ষমতার ও বিরোধীদল ও ভিন্ন মতের মানুষদের প্রতিশোধের অব্যাহত চর্চা? দেশের ভবিষ্যৎ এই প্রশ্নের জবাবের উপর নির্ভর করছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে একদমই ভেঙে দিয়েছে এবং চারজন নিহত ও অন্তত একটি ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনার মাধ্যমে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অভিযোগগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী, প্রতিহিংসামূলক নীতি বাস্তবায়ন করছে। কেবল মাঠ পর্যায়ে নয়, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ ও রাজনৈতিক বক্তব্য সরাসরি কর্মীদের আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে। কুয়েটের উপাচার্য থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী, এমনকি রাজনৈতিক মিত্রদের ওপরও হামলার খবর এসেছে। দিনাজপুরে ছেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি, পঞ্চগড়ে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর, বাগেরহাটে যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা, ফেনীর ফুলগাজীতে দোকান ভাঙচুর, নোয়াখালীর সেনবাগে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অতর্কিত হামলা, কুড়িগ্রামে কুপিয়ে জখম, খুলনায় বাড়িতে আগুন ও প্রাণনাশের হুমকি—এসব ঘটনা প্রমাণ করছে, বিএনপি একটি সংগঠিত সহিংসতার মডেল চালু করেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ভোটাধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারকে তারা পাত্তা দিচ্ছে না; বরং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি এক পরম সহিংস, প্রতিশোধমূলক মনোভাব বজায় রাখছে। যদি ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই প্রতিশোধের উন্মাদনা, তাহলে এটি কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং আধিপত্য ও ভয়ভীতি তৈরির রাজনীতি। জনগণ আজ স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে যে, ভোটের আনন্দ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা বদলে একটি তীব্র সহিংসতার নকশা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, ন্যায় এবং আইনের শাসন সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আরও ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নির্বাচনের পর সহিংসতার শিকার হয়েছেন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দেশের সাধারণ নাগরিক, জার্নালিস্ট, ব্লগার, একটিভিস্ট এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি এর কর্মী, সমর্থক ও তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। ফেনী, সিরাজগঞ্জ, সন্দ্বীপ, চকরিয়া, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় বাড়িতে হামলা, দোকান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো এলাকায় ছাত্রদল এবং প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের যৌথ সংঘর্ষে মানুষ আহত হয়েছে। এসব ঘটনার লক্ষ্য একটাই ভয়, আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন করা। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোট বা যুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং রক্ত, ভাঙচুর এবং হুমকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তা শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীকে নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল করে। আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার যদি দলের প্রভাব এবং ভয়ভীতি প্রতিষ্ঠার চাপে নস্যাৎ হয়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? গণতন্ত্রের মর্মার্থ হলো মতবিরোধ সহনশীলভাবে সমাধান করা, জননিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সকল নাগরিককে সমানভাবে নিরাপদ রাখা, কিন্তু বিএনপির এই সহিংসতা এই মৌলিক নীতিগুলোকে চূর্ণ করেছে। নির্বাচনের নামধারণে সংগঠিত এই সহিংসতা রাষ্ট্রকে বিভক্ত করছে, সামাজিক শান্তি ভেঙে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এভাবে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুধুই দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সবচেয়ে গুরুতর এবং অনুযোগ্য প্রশ্ন হলো, এই নৃশংস পরিস্থিতির নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় কে নেবে? বিএনপির রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবলমাত্র নির্বাচন জেতার সীমায় সীমাবদ্ধ নয়; তাদের মূল দায়িত্ব হলো কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, সংযম বজায় রাখা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। কিন্তু যেখানে সহিংসতা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে, বাড়িঘর, দোকানপাট ও মানুষকে আক্রান্ত করা হয়েছে, এমনকি হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের মতো নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে তাহলে সেটি একেবারে চরম অবহেলার পরিচায়ক। এই ধরনের ঘটনা ঘটলে কেবল আদালত ও প্রশাসনই নয়, বিএনপির পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও কঠোরভাবে জবাবদিহি করতে হবে। পাশাপাশি, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা আসা প্রয়োজন যে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, ন্যায়ের শাসন এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণই রাজনীতির ভিত্তি। জনগণকে বোঝার সুযোগ দিতে হবে যে, ক্ষমতার জন্য হিংসা, ভয়ভীতি বা দমনমূলক প্রক্রিয়া মোটেও গণতন্ত্র নয়। অন্যথায় সাধারণ মানুষ ভাববে, তারা কি সত্যিই একটি সন্ত্রাসমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র চেয়েছিল, নাকি বিএনপি ও তার নেতৃত্বের পরিকল্পিত সহিংসতার নতুন অধ্যায়কে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। গণতন্ত্র টিকে থাকে আইনের শাসন, মানবাধিকার, ন্যায় এবং রাজনৈতিক সংযমের উপর; যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, যদি তারা এই নীতিগুলোকে উপেক্ষা করে, তবে ইতিহাস এবং জনগণ তাদের কঠোরভাবে বিচার করবে এবং তাদের রাজনৈতিক বৈধতা চিরতরে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার ওপর এবং এই দায়িত্বের ব্যর্থতা দেশের জন্য অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির দরজা খুলে দেয়।