বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে আওয়ামীলীগের ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনের ভেতরে হাসিনার ফ্যাসিবাদী কাঠামো প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ড. ইউনুসের নেতৃত্বতাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়, অর্থাৎ বিচারব্যবস্থা থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠ, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতিদের অপসারণ না করে, তাহলে দেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর ফলে আমাদের সামনে আরও উসমান হাদী, অভিজিৎ, বিশ্বজিৎ বা আবরার ফাহাদদের মতো আরো হাজারো বিপজ্জনক সন্ত্রাসী খুনের ঘটনা ঘটবে। এটি কোনো অনুমান নয়, বরং বিগত এক দশকের কড়া বাস্তবতার পরিচয়। আওয়ামীলীগের শাসন আমল প্রমাণ করেছে, যখন বিচারকরা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করেন, তখন আদালত আর ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না, বরং ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থরক্ষা করার একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিক, ব্লগার, সাংবাদিক ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীরা, নিরাপদ বোধ করতে পারে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষা করতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল পুরো বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে, সরকার ভয়ঙ্কর নীরবতা অবলম্বন করছে, যা প্রশ্ন তোলে এই নীরবতা কি অক্ষমতা, নাকি রাজনৈতিক আপসের অংশ? এই অগ্রহণযোগ্য অবস্থার কারণে দেশের জনগণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে।
উসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম ও উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হাদী মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি একাধিকবার ফোন, মেসেজ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের হুমকির বিষয় সতর্কভাবে জানিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ অভিযোগের সীমায় থেমে যাননি; তিনি জিডিও করেছেন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দাবি তুলেছেন। তবুও বর্তমান সরকার ও প্রশাসন তার জীবন রক্ষা করতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। একজন ব্লগার, লেখক বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মী যখন রাষ্ট্রের কাছে সাহায্যের হাত বাড়ায় এবং নিরাপত্তা চায়, কিন্তু সে সাহায্য নিশ্চিত করা হয় না, তখন তা শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি এক গভীর নৈতিক ব্যর্থতা, যা রাষ্ট্রীয় দায় ও কর্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ধরনের অগ্রহণযোগ্য উদাসীনতা জনগণকে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা দেয় যে কোনো নাগরিক, বিশেষত যারা সত্যবাদিতা ও স্বাধীন মত প্রকাশ করে, তারা রাষ্ট্রের সুরক্ষায় আস্থা রাখতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকে, তাহলে প্রশ্ন তোলে কেন হাদীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি? কেন তার প্রাপ্ত হুমকিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়নি? এই ব্যর্থতা শুধু হাদীর জীবনকে হারানোর কারণে নয়, বরং দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভয়, অনাস্থা ও হতাশা বৃদ্ধি করেছে, যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
আরও ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক প্রশ্ন উঠে আসে যখন আমরা দেখি, সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অভিযুক্ত সন্ত্রাসীরা কীভাবে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সহিংসতা ও হত্যার মতো অপরাধে জড়াতে পারে। হাদীর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফয়সাল একজন সুপরিচিত ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন এটি কোনো গোপন তথ্য নয়; এটি সবার জানা ঘটনা। তিনি জেল থেকে বের হয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আবারও ভয়ঙ্কর সহিংস ঘটনায় জড়ান, যা প্রমাণ করে, এমন অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও নৈতিকতার প্রতি বিরাট ব্যর্থতা। প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠে কীভাবে এত বিপজ্জনক একজন ব্যক্তি জেল থেকে মুক্তি পেতে পারে? কোন আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন ঘটনা সম্ভব হলো? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর জানা থাকা উচিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের, কারণ বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন এখনও সেই পুরোনো রাজনৈতিক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার যদি এই কাঠামো ভেঙে নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় বা এটি করতে চায় না, তাহলে তাদের “সংস্কার” বা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কেবল মুখের বুলিই হয়ে থাকে। এ ধরনের উদাসীনতা এবং নীরবতা জনগণের মধ্যে ভয়, অনাস্থা এবং সরকারের প্রতি অবিশ্বাস জন্মায়। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী ও জার্নালিস্ট, ব্লগারদের নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট তারা যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে দেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তা ক্রমশ মারাত্মক সংকটে পতিত হবে।
আজও আমরা বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, আদালত এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সেই পুরোনো স্বৈরাচারী শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি ও কর্মকর্তাদের বহাল তবিয়ত দেখে চমকিত হই না। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই প্রকাশ্যে বা নীরবে ফ্যাসিস্ট শাসনের সুবিধাভোগী ছিলেন এমন অভিযোগ বহুবার প্রমাণিত ও উঠেছে। এরা শুধু রাজনৈতিকভাবে আনুগত্য দেখিয়েছে নয়, বরং দেশের ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি ভয়ঙ্কর precedent স্থাপন করেছে। একইভাবে, প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে এখনও সেই সময়ের ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠ নেতা-কর্মীদের প্রভাব দৃশ্যমান, যা রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে আরও উৎসাহিত করে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা শাস্তি পাবে, যদি বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনের কাঠামো আজও তাদের জন্য সুবিধাজনক থাকে? একজন আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, ব্লগার বা সাংবাদিক কীভাবে ন্যায়বিচারের আশা করতে পারে, যখন আদালতের চেয়ারগুলো সেই পুরোনো শাসনের দোসরদের দ্বারা দখল করা আছে? এই দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি শুধু রাজনৈতিক দলের সমস্যা নয়, বরং দেশের সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে। জনগণ যখন বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায়, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো স্বচ্ছতা হারায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস হওয়ার পথে যায়। এ বাস্তবতায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া দেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তা আরও সংকটময় হয়ে উঠবে।
আজ স্পষ্টভাবে বলা যায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সত্যিই জনগণের সরকার হতে চায়, তাহলে তাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র সংগঠন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের ঘনিষ্ঠ বিচারপতিদের অপসারণ করা এবং একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয় নয়; বরং এটি জনগণের নিরাপত্তা, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার প্রশ্ন। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, যদি হত্যার হুমকি ও ভয়বহ পরিস্থিতি সত্ত্বেও মানুষ রক্ষা না পায়, তাহলে সেই রাষ্ট্র তার নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। উসমান হাদী, অভিজিৎ রায়, আবরার ফাহাদ, বিশ্বজিৎদের রক্ত কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি একটি বার্তা, একটি জিজ্ঞাসা এই সরকার কি সত্যিই পরিবর্তনের প্রতীক হতে চায়, নাকি এটি পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোর নতুন রূপ মাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। জনগণ আজ আরও বেশি সতর্ক; তারা জানে যে যদি বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের মধ্যে পুরোনো ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক আনুগত্য এবং স্বৈরাচারী প্রভাব বজায় থাকে, তবে রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব শুধুই আইন প্রয়োগ করা নয়; তাদের মূল কর্তব্য হলো জনগণের প্রতি আস্থা পুনর্নির্মাণ করা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও দমন নীতি থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত রাখা। এই নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হলে দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পতিত হবে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়ঙ্কর প্রভাব তৈরি হবে।
ছবি: ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিশ্বজিৎকে হামলা করছে
