শেখ হাসিনার সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন রঙ নিয়ে এসেছে, তবে সেই পরিবর্তনটি কী ধরনের হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। একদিকে, দেশের জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সুশাসন চায়, অন্যদিকে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে এক বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিতে পারে। হাসিনার পতনের পর, ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা এবং তাদের সহিংস কার্যক্রমের বিস্তার একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতি ও সমাজে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছিল, তাদের এখন সুযোগ মিলেছে। তারা সরকারের পতনকে একটি তাদের সংগ্রামের শুরু হিসেবে দেখতে পারে, যার মাধ্যমে তারা মৌলবাদী শাসন কায়েম করার চেষ্টা করবে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির ধ্বংসের সময় “আল্লাহ আকবার” স্লোগান দেয়ার ঘটনাটি এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। “আল্লাহ্ আকবার” একটি পবিত্র ইসলামিক বাক্য, যা সাধারণত ইবাদত ও প্রশংসার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো যখন এটিকে সহিংসতার সাথে জুড়ে দেয়, তখন তারা মূলত ইসলামকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা পাঠায়।উগ্রবাদীরা ধর্মীয় স্লোগান “আল্লাহ আকবার” দিয়ে তাদের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা একটি সাম্প্রদায়িক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তিকে বিপন্ন করতে পারে, যেখানে স্বাধীনতা, মানবাধিকার, এবং মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, যেখানে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সীমানা উন্মুক্ত হয়েছে। জনগণের অসন্তোষের কারণেই সরকার পতন হয়েছে, কিন্তু এই পরিবর্তনটি যদি উগ্রবাদী শক্তির হাতে চলে যায়, তবে এটি দেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা তৈরি করা যাতে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঠেকানো যায় এবং দেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ধারা বজায় রাখা যায়। কোনো শক্তি যদি জনগণের মৌলিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বিপন্ন করে, তবে তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক হতে পারে।
ইসলাম শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং ন্যায়ের ধর্ম। কেউ যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে নাশকতা বা সহিংসতা চালায়, তাহলে সেটা প্রকৃত ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মুসলমানদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং ইসলামবিরোধী শক্তিকে ইসলামকে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দেয়।
ধর্মকে রক্ষা করতে হলে আমাদের উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপব্যবহারকে রুখতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ প্রকৃত ইসলাম অন্যায়, জুলুম ও অশান্তির বিরুদ্ধে। যারা ইসলামের নাম নিয়ে সন্ত্রাস চালায়, তারা আসলে ইসলামকেই কলঙ্কিত করে।
স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হল উগ্রবাদীদের উত্থান রোধ করা এবং দেশকে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা। রাজনৈতিক দলগুলো এবং জনগণকে একত্রিত হয়ে উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যাতে তারা দেশের শাসনব্যবস্থায় কোনো ধরনের অবৈধ প্রভাব বিস্তার না করতে পারে। একমাত্র যদি বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বজায় রাখে, তবে তা একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভবিষ্যত গড়তে পারবে।
