বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিবার নির্বাচনের আগে দেশে উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও বিভাজন তৈরি হয়। এবারের নির্বাচনকে ঘিরেও রয়েছে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্ন। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে—এই তারিখ ঘোষণার পেছনের প্রক্রিয়া এবং অন্তবর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একটি মাত্র দলের (বিএনপি) একক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তারিখ ঘোষণা করাটা এই সরকারকে কতটা নিরপেক্ষ রাখল, সেটাই আজকের আলোচ্য বিষয়।
বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার, যেটি ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করে কাজ করছে, তাদের বড় দায়িত্ব ছিল সবার আস্থা অর্জন করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পথরেখা তৈরি করা। অথচ এদের প্রথম বড় ভুল আজ—একটি মাত্র দলের (বিএনপি) একক নেতার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা। এর মাধ্যমে যে বার্তাটি জনগণ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল পেয়েছে, তা হলো—এই সরকার সম্ভবত একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে তারিখ নির্ধারণ হলে, প্রশ্ন ওঠে: এই সরকার কি বিএনপির পক্ষে কাজ করছে? যেখানে দেশের অনেক রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ বলছে যে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার ও আলোচনার পথ তৈরি করা দরকার, সেখানে এত তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনের ঘোষণা যথেষ্ট সন্দেহজনক।
একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা যথেষ্ট নয়। পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো—বিশেষ করে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যম—সব কিছুর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হয়। অথচ বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখে এসেছি, এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে আটকা পড়েছে। বিচার বিভাগ অনেক সময় রাজনৈতিক মামলায় পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশে অনেক আওয়ামীলীগের লোকও রয়ে গিয়েছে, যারা আওয়ামীলীগের শাসন আমলে জনগনের উপর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কার ছাড়া একটি সর্বজনগ্রাহ্য, অংশগ্রহণমূলক, ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়।
ড. ইউনুস, অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এখন নানামুখী প্রশ্ন উঠছে। তার অতীত সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং বিভিন্ন দলের প্রতি মনোভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তিনি আদতে একজন কূটনৈতিক ব্যালেন্স বজায় রাখার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। একটি নিরপেক্ষ অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে তার উচিত ছিল সকল দলের সঙ্গে সমানভাবে আলোচনা করা। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আগে জাতীয় সংলাপ, মতবিনিময় সভা, এবং অন্ততপক্ষে প্রাথমিক সংস্কারের খসড়া ঘোষণা করা উচিত ছিল। তিনি তা না করে একপক্ষীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন এগিয়ে এনেছেন, যা তাকে একটি পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে। এই সিদ্ধান্ত যদি গণআলোচনা ছাড়া বাস্তবায়িত হয়, তবে এই সরকার তার নিরপেক্ষতা ও নৈতিক ভিত্তি হারাবে।
বর্তমান সরকার এবং ড. ইউনুসের নেতৃত্বে থাকা অন্তবর্তীকালীন সরকার এখনো চাইলে, একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে, প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় অস্থায়ী হলেও পুনর্বিন্যাস বা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু করতে পারে, এবং সর্বোপরি, সব দলের সমঝোতায় একটি নতুন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করতে পারে। তা না হলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই, এবং নতুন সরকার গঠনের বৈধতা নিয়েই শুরু হবে বিতর্ক, যা দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য হবে মারাত্মক ক্ষতিকর।
