বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য ছাত্ররাজনীতি একসময় আশার আলো ছিল। কিন্তু আজ সেটি রূপ নিয়েছে ভয়ঙ্কর দানবে। ছাত্রলীগের মতোই ছাত্রদলও আজ শিক্ষাঙ্গনে চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতীক। দুই পক্ষের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য থাকলেও কার্যকলাপে তারা একই — ভিন্ন কেবল রঙে ও গডফাদারে। তাই প্রশ্ন উঠে: ছাত্রদলের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে কবে? ছাত্রদলের জন্ম হয়েছিল এক আদর্শিক লক্ষ্য নিয়ে, কিন্তু বাস্তবতা হলো আজ তারা বিএনপির সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়েছে। দেশের সব প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদলের উপস্থিতি মানেই অস্ত্র, সহিংসতা ও আতঙ্ক।
তারা ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর দখলদার মনোভাব চাপিয়ে দেয়। যারা ছাত্রদলের রাজনীতিতে যোগ দেয় না, তাদের জন্য রয়েছে মারধর, মিথ্যা মামলা ও ভীতি প্রদর্শনের মতো হুমকি। ছাত্রলীগের মতো তারাও হলে হলে চাঁদাবাজি, র্যাগিং, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থবাণিজ্যে জড়িত।ছাত্রদলের একাধিক নেতা-কর্মী অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়—ছাত্রদলের তৎপরতা কোনো ছাত্রকল্যাণমূলক কাজ নয়, বরং চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ, সরকারি সম্পদ ধ্বংস, সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর দমনপীড়নের সাথে জড়িত। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ছাত্রদল হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতীক। সাধারণ ছাত্রদের জন্য হলে জায়গা পাওয়া দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাদের কর্মকাণ্ডে শিক্ষক মারধরের ঘটনাও কম নয়। ছাত্রদলের সন্ত্রাসী পরিচয়ের সাথে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নিয়েও একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক তদন্তে দেখা গেছে, তারা উগ্রপন্থীদের সাথে যোগসাজশে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটেছে।
২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের অবরোধ-হরতালের সময় সারা দেশে যে আগুন-সন্ত্রাস চলেছিল, তার বড় অংশের নেপথ্যে ছাত্রদলের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ককটেল হামলা, পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা, বাস-ট্রাকে আগুন দেওয়া — এসবই ‘রাজনীতি’র নামে তারা করেছে। তাদের চোখে সাধারণ মানুষ যেন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া আদায়ের পুতুল, যাকে যখন দরকার হয়, তখন জ্বালিয়ে দেওয়া যায়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কথা আজ কারও অজানা নয়। কিন্তু অনেকেই ভুলে যান, ছাত্রদলও সেই একই কাজ করে। তারা ক্যাম্পাসে ঠিক তেমনই দখলদারিত্ব, অস্ত্র চালানো, শিক্ষক লাঞ্ছনা, আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনে লিপ্ত থাকে। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল—এই দুটি সংগঠনই আজ শিক্ষাঙ্গনের বিষফোঁড়া। রাজনীতি নয়, বরং ক্ষমতার দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনই তাদের একমাত্র কাজ। অথচ শিক্ষাঙ্গন হওয়া উচিত জ্ঞানের চর্চার পবিত্র স্থান। কিন্তু এই সংগঠনগুলো সেই পরিবেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
ছাত্রদলকে শিক্ষার্থীদের সংগঠন বলা ভুল। এটি মূলত বিএনপির ‘যুব অস্ত্রধারীদের’ একটি শক্ত ঘাঁটি। এখানে ছাত্র হওয়ার চেয়ে দলীয় আনুগত্য আর ভয়ংকর কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দক্ষতা বেশি মূল্যায়িত হয়। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নয়, ছাত্রদলের রাজনীতি ছাত্রদের ব্যবহার করে বিএনপি দলের ক্ষমতা অর্জনের পথ সুগম করে। ফলে এর অস্তিত্ব নিজেই শিক্ষা ও রাজনীতির জন্য এক বড় হুমকি। যে কোনো সংগঠন যদি ধারাবাহিকভাবে সহিংসতায় লিপ্ত থাকে, নাগরিকদের ক্ষতি করে, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার ভিত দুর্বল করে, তাহলে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যদি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ‘নিষিদ্ধ’ দাবিতে যুক্তি থাকে, তাহলে ছাত্রদলও ঠিক একই কারণে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আমরা পক্ষপাতদুষ্ট নই, বরং আমরা চাই রাজনীতি হোক গণমুখী, শিক্ষাঙ্গন হোক সন্ত্রাসমুক্ত। এটা কোনো দলীয় অবস্থান নয়, এটা সমাজ ও শিক্ষা রক্ষার দাবি। ছাত্রদলের মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
