বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন বরাবরই ছিল পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি সমাজের অনাচার, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নানা অসাম্যর বিরুদ্ধে একটি সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। শিক্ষার্থী, তরুণ, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে এমন আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু সম্প্রতি এই আন্দোলনের কিছু সমন্বয়কের বিরুদ্ধে যে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে, তা আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
সামাজিক মাধ্যমে ও কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—কিছু সমন্বয়ক তাদের প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট হল বা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চাঁদা দাবি করছেন। কেউ কেউ আবার নিজেরা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকার বিনিময়ে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। যদিও এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, তবুও অভিযোগগুলোর অস্তিত্বই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকে ধ্বংস করার পক্ষে যথেষ্ট। এই প্রশ্ন এখানে উঠে আসে: যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলে, তারা নিজেরাই যদি আরেক ধরনের ক্ষমতা ও সুবিধাবাদের আশ্রয় নেয়, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কাকে বিশ্বাস করবে? যে আদর্শ নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা কি শুধুই কাগুজে স্লোগান হয়ে থাকবে?
আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের বোঝা উচিত, একবার যদি নেতৃত্বের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সেই আন্দোলনের ন্যায্য দাবিগুলোও জনসমর্থন হারাতে শুরু করে। এতে রাষ্ট্র বা প্রশাসন নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই হাজারো তরুণ, যারা একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন দেখে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক অভিযোগ শুধু আইনত নয়, নৈতিকভাবেও এই আন্দোলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি একদিকে যেমন নেতৃত্বের দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে আন্দোলনের আদর্শ ও ভরসাকে আঘাত করে। ভবিষ্যতে এই আন্দোলনের কোনো দাবি যদি অগ্রাহ্য হয় বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তার দায় আন্দোলনের সেসব নেতাদেরই নিতে হবে, যারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা করেন না।
আমরা যারা একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি, তারা চাই—এই আন্দোলন যেন সত্যিকার অর্থে সবার জন্য, স্বচ্ছ ও নৈতিক ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। নেতৃত্বে যারা থাকবেন, তাদের নিজস্ব স্বার্থে নয়, বরং বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে হবে। শুধু শ্লোগান দিলে হবে না—নিজেদের চরিত্র, কর্মকাণ্ড এবং সংগঠনের আর্থিক ও নৈতিক স্বচ্ছতা দিয়েই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেবল স্লোগান, মিছিল আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর ভিত্তি হতে হবে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, এবং নেতৃত্বে জবাবদিহিতা। না হলে, এই সংগঠনও একদিন আরেকটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতে পরিণত হবে—যারা ক্ষমতার মোহে নিজেদের আদর্শকেই বিসর্জন দেয়।
