বাংলাদেশে নির্বাচন শব্দটি এখন আর গণতন্ত্রের প্রতীক নয়—এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি তামাশা, একটি সাজানো নাটক। ভোটারহীন নির্বাচন, একদলীয় প্রার্থীদের বিজয় মিছিল, প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা—এইসবই দেশের মানুষকে হতাশ করেছে। আজ আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যেখানে কেউ আর বিশ্বাস করে না যে, নির্বাচন মানেই জনগণের মত প্রকাশের পবিত্র উৎসব। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে একটাই দাবি উঠে এসেছে: পূর্ণ সংস্কার ছাড়া নির্বাচন নয়। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য চাই একটি দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ উল্টো। পুলিশ ও প্রশাসন বিএনপির পক্ষে ও বিরোধী দলের কর্মীদের দমন করতে ব্যস্ত, আর আদালতেও নিরপেক্ষতার অভাব প্রকট। তাহলে এই অবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?
দেশে কেন নারী নিরাপদ নয়: জবাব দাও সরকার!
বাংলাদেশের মুরাদনগরে ঘটে গেলো একটি নির্মম ধর্ষণের ঘটনা আবারো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো—এই রাষ্ট্রে নারীর জন্য নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। যখন একটি মেয়ে ধর্ষিত হয়, তার শরীর ছিন্নভিন্ন করে পাশবিকভাবে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি ধর্ষক দায়ী থাকে না—দায়ী থাকে রাষ্ট্র, দায়ী থাকে সেই সরকার যারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই অপরাধটি শুধু একজন অপরাধীর কাজ নয়—এটি আমাদের সমাজের অব্যবস্থা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা সন্ত্রাস, এবং সেই রাষ্ট্রীয় মেশিনারির নিস্পৃহতা ও দুর্বলতার এক কালো প্রতিচ্ছবি।
একটি মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার জীবন শেষ হয়ে যায়—কিন্তু রাষ্ট্র তার জন্য কী করে? শুধু ফাইল টানাটানি, মামলা গুম, আর যেনতেন তদন্ত? এই রাষ্ট্র যদি প্রতিবার নারীর সম্মানের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে সে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আর নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলে চলবে না। তাদের সাহসিকতা, নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতা আজ পরীক্ষার মুখে। যারা এই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, পুলিশের ওপর জনসাধারণের আস্থা একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আজকে ধর্ষকেরা জানে—এই দেশে তাদের বিচার ঠিকঠাক হয়না, বা হলেও সেটা হবে দীর্ঘসূত্রতায় গলা টিপে মেরে ফেলার মতো। এ কারণেই একের পর এক ধর্ষণ ঘটে, ধর্ষণের পর হত্যা ঘটে। মুরাদনগরের ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।
ভোট ডাকাতির দায়: সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের বিচারের সময় এখন
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, এবং এর অন্যতম বড় কারণ হলো নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব। একটি দেশের নির্বাচন কমিশন যত বেশি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হয়—তত বেশি সেই দেশ গণতন্ত্রে রক্ষা পায়। কিন্তু বাংলাদেশের গত ১৫ বছরের বাস্তবতায় দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন কেবল একটি গৃহপালিত প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িযছিল, যেখানে সাবেক তিনজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনগণের বিশ্বাস ভেঙেছেন এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বিকার, পক্ষপাতদুষ্ট ও জনগণ-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিলেন।
২০১৪ সালের নির্বাচন রকিবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচন বিশ্বে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, কারণ বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিধান্বিত ছিল। এই নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে একটি কৌতুকের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, এবং প্রশ্ন উঠে রকিবউদ্দিনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। তিনি তখন সরকারি প্রণোদনার আশায় চোখ বুজে একতরফা ভোটের আয়োজন করেন।
নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু সংস্কার কোথায়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিবার নির্বাচনের আগে দেশে উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও বিভাজন তৈরি হয়। এবারের নির্বাচনকে ঘিরেও রয়েছে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্ন। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে—এই তারিখ ঘোষণার পেছনের প্রক্রিয়া এবং অন্তবর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একটি মাত্র দলের (বিএনপি) একক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তারিখ ঘোষণা করাটা এই সরকারকে কতটা নিরপেক্ষ রাখল, সেটাই আজকের আলোচ্য বিষয়।
বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার, যেটি ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করে কাজ করছে, তাদের বড় দায়িত্ব ছিল সবার আস্থা অর্জন করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পথরেখা তৈরি করা। অথচ এদের প্রথম বড় ভুল আজ—একটি মাত্র দলের (বিএনপি) একক নেতার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা। এর মাধ্যমে যে বার্তাটি জনগণ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল পেয়েছে, তা হলো—এই সরকার সম্ভবত একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে তারিখ নির্ধারণ হলে, প্রশ্ন ওঠে: এই সরকার কি বিএনপির পক্ষে কাজ করছে? যেখানে দেশের অনেক রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ বলছে যে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার ও আলোচনার পথ তৈরি করা দরকার, সেখানে এত তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনের ঘোষণা যথেষ্ট সন্দেহজনক।
ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদলও নিষিদ্ধ হোক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য ছাত্ররাজনীতি একসময় আশার আলো ছিল। কিন্তু আজ সেটি রূপ নিয়েছে ভয়ঙ্কর দানবে। ছাত্রলীগের মতোই ছাত্রদলও আজ শিক্ষাঙ্গনে চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতীক। দুই পক্ষের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য থাকলেও কার্যকলাপে তারা একই — ভিন্ন কেবল রঙে ও গডফাদারে। তাই প্রশ্ন উঠে: ছাত্রদলের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে কবে? ছাত্রদলের জন্ম হয়েছিল এক আদর্শিক লক্ষ্য নিয়ে, কিন্তু বাস্তবতা হলো আজ তারা বিএনপির সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়েছে। দেশের সব প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদলের উপস্থিতি মানেই অস্ত্র, সহিংসতা ও আতঙ্ক।
তারা ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর দখলদার মনোভাব চাপিয়ে দেয়। যারা ছাত্রদলের রাজনীতিতে যোগ দেয় না, তাদের জন্য রয়েছে মারধর, মিথ্যা মামলা ও ভীতি প্রদর্শনের মতো হুমকি। ছাত্রলীগের মতো তারাও হলে হলে চাঁদাবাজি, র্যাগিং, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থবাণিজ্যে জড়িত।ছাত্রদলের একাধিক নেতা-কর্মী অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়—ছাত্রদলের তৎপরতা কোনো ছাত্রকল্যাণমূলক কাজ নয়, বরং চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ, সরকারি সম্পদ ধ্বংস, সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর দমনপীড়নের সাথে জড়িত। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ছাত্রদল হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতীক। সাধারণ ছাত্রদের জন্য হলে জায়গা পাওয়া দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাদের কর্মকাণ্ডে শিক্ষক মারধরের ঘটনাও কম নয়। ছাত্রদলের সন্ত্রাসী পরিচয়ের সাথে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নিয়েও একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক তদন্তে দেখা গেছে, তারা উগ্রপন্থীদের সাথে যোগসাজশে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটেছে।
