CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

রামিসা হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রের চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা

রামিসা নামের একটি শিশুকে নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর গভীর ও উদ্বেগজনক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি শিশুকে তার নিজের বাসস্থান বা আশপাশের পরিবেশে নিরাপদ রাখতে না পারা মানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থা কোথাও না কোথাও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ঘটনা ঘটে গেলে সাধারণ মানুষের প্রথম এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথায় ছিল এবং আগাম প্রতিরোধ কেন সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া আসে ঘটনার পর, প্রতিরোধের জায়গায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি এখনো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল এবং অপ্রতুল। এই ব্যর্থতার দায় শুধু সরকার বা প্রশাসনের, এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, নজরদারির ঘাটতি এবং সামাজিক উদাসীনতার সম্মিলিত ফল। যখন একটি দেশের সবচেয়ে নিরীহ ও দুর্বল নাগরিক, অর্থাৎ শিশুরাও নিরাপদ থাকে না, তখন সরকার ও পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিক নিরাপত্তা ঘাটতির একটি ভয়াবহ এবং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া উদাহরণ।

বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো “ঘটনা-পরবর্তী তৎপরতা”কে সাফল্য হিসেবে দেখানোর প্রবণতা। প্রতিটি ভয়াবহ ঘটনার পর দ্রুত গ্রেপ্তার, তদন্ত কমিটি গঠন এবং কঠোর বক্তব্য দেওয়া হয়, যা প্রথমে জনমনে স্বস্তি দিলেও বাস্তব পরিবর্তন আনে না। কারণ একই ধরনের অপরাধ আবারও ঘটে, একই ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি থেকে যায়। শিশু সুরক্ষা বা কমিউনিটি নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদী, কার্যকর নীতি মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান নয়। স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা দুর্বল, পুলিশিং অনেক জায়গায় reactive, proactive নয়। ফলে জনগণের মধ্যে একটি স্থায়ী অনাস্থা তৈরি হয়েছে সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, শুধু ঘটনার পর শোক প্রকাশ করে। এই অবস্থায় সরকারের দায় শুধু আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়াতেও। ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা দেখানো, এবং সেই জায়গায় ধারাবাহিক ব্যর্থতা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও জামায়াতে ইসলামী এই ধরনের ঘটনায় দায়িত্ব এড়াতে পারে না, কারণ তারা প্রায়ই এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সীমাবদ্ধ থাকে। শক্ত ভাষায় বিবৃতি, আন্দোলনের হুমকি, বা সরকারের বিরুদ্ধে দোষারোপ এগুলো শোনা গেলেও বিকল্প রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো বাস্তব রূপরেখা খুব কমই সামনে আসে। একটি কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব শুধু সমালোচনা নয়, বরং নীতিগত বিকল্প উপস্থাপন করা, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, বিচার ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষার মতো বিষয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি ভয়াবহ ঘটনা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়। এতে সমস্যার গভীরতা বোঝা হয় না, বরং আরও বিভাজন তৈরি হয়। ফলে বর্তমান বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠে না, যা এই ধরনের অপরাধ কমানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল।

এই ধরনের ঘটনা আমাদেরকে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সরকার বা বিরোধী দল একে অপরকে দোষারোপ করলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই রাজনীতি অর্থহীন হয়ে যায়। শিশু হত্যার মতো ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি মানবিক সংকট, যেখানে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। আইন প্রয়োগ, তদন্ত, বিচার এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবকিছুতেই স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকেও আরও সচেতন হতে হবে, কারণ রাষ্ট্র একা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে সরকারের দায়িত্বই মূল, এবং সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত এই ধরনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার, যা বাস্তবে নিশ্চিত করতে না পারলে বিএনপি ও তারেক রহমানের সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।