CategoriesDemocracyFestivalJusticePolitics

সরকারের সমালোচনা ও কার্টুন শেয়ারেই কারাগার: ভিন্ন মত দমনে ফ্যাসিবাদী আচরন করছে সরকার

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইফকে নিয়ে ফেসবুকে একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ও সমালোচনা করার অভিযোগে এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেফতার করার ঘটনা আবারও দেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি কে নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র শেয়ার করেছিলেন, যেটি পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টিতে আপত্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমার ব্যক্তিগত মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য খুবই উদ্বেগজনক। কারণ একটি সমাজে ব্যঙ্গ, সমালোচনা এবং কার্টুন সবসময়ই রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদি শুধুমাত্র একটি শেয়ার বা মত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজের মত প্রকাশ থেকে সরে আসবে। নুরুল ইসলাম মনি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকা উচিত, কারণ গণতন্ত্রে সমালোচনা দমন করা নয় বরং তা গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করা গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ বা পূর্বের সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ। এ এম হাসান নাসিমের বিরুদ্ধে যে ধারা ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে যে এটি আসলে কতটা ন্যায়সঙ্গত এবং কতটা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি বা সমালোচনামূলক পোস্টকে কেন্দ্র করে বহু গ্রেফতার ও মামলা হয়েছিল। এখন যদি একই ধরনের প্রবণতা আবার ফিরে আসে, তবে সেটি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। আইন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই আইনের প্রয়োগ যেন মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত না করে। নুরুল ইসলাম মনি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রতি ব্যঙ্গ যদি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে ভয় পাবে। আমার মতে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকা উচিত শুধুমাত্র প্রকৃত সাইবার অপরাধ যেমন হ্যাকিং, প্রতারণা বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার মতো বিষয় মোকাবিলার জন্য, মত প্রকাশ দমনের জন্য নয়।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকেও এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায় যেখানে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমালোচনা অনেক সময় সহ্য করা হয় না। নুরুল ইসলাম মনি যেহেতু জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, তার ক্ষেত্রে সমালোচনা বা ব্যঙ্গচিত্র স্বাভাবিক রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সেই সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতা বা দলের উচিত সমালোচনার জবাব রাজনৈতিকভাবে দেওয়া, আইন প্রয়োগ করে নয়। কারণ আইন যদি রাজনৈতিক মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়। এ এম হাসান নাসিমের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়, বরং এটি একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয় যে বাংলাদেশে মত প্রকাশের জায়গা কতটা নিরাপদ। জনগণ যদি মনে করে যে তাদের একটি পোস্ট বা শেয়ার তাদের জেল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, তাহলে সমাজে ভয় এবং আত্মসেন্সরশিপ বাড়বে।

এই ঘটনার প্রভাব শুধু একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর গ্রেফতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় যেসব সমালোচনা সাইবার আইনের আওতায় দমন করা হয়েছিল, সেই একই ধরনের প্রবণতা আবার দেখা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নুরুল ইসলাম মনি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রতি ব্যঙ্গকে যদি রাষ্ট্র কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, তাহলে সেটি মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে ফেলবে। সরকারের উচিত আইনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র তখনই গড়ে ওঠে যখন মানুষ নির্ভয়ে তাদের মত প্রকাশ করতে পারে, এমনকি সেই মত যদি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও হয়।