বাংলাদেশে নির্বাচন শব্দটি এখন আর গণতন্ত্রের প্রতীক নয়—এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি তামাশা, একটি সাজানো নাটক। ভোটারহীন নির্বাচন, একদলীয় প্রার্থীদের বিজয় মিছিল, প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা—এইসবই দেশের মানুষকে হতাশ করেছে। আজ আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যেখানে কেউ আর বিশ্বাস করে না যে, নির্বাচন মানেই জনগণের মত প্রকাশের পবিত্র উৎসব। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে একটাই দাবি উঠে এসেছে: পূর্ণ সংস্কার ছাড়া নির্বাচন নয়। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য চাই একটি দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ উল্টো। পুলিশ ও প্রশাসন বিএনপির পক্ষে ও বিরোধী দলের কর্মীদের দমন করতে ব্যস্ত, আর আদালতেও নিরপেক্ষতার অভাব প্রকট। তাহলে এই অবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?
২০১৪ সালের “একদলীয় নির্বাচন” এবং ২০১৮ সালের “রাতে ভোট কেলেঙ্কারী” ও ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করেছে। কোটি কোটি মানুষ ভোট দিতে পারেনি, আগেই ব্যালট বাক্স ভরে গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঠে নামতেই দেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ওসি—সব স্তরের কর্মকর্তাদের দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পরিবর্তন করতে হবে। নির্বাচনের সময় তাদের কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখতে হবে। নির্বাচনী অপরাধ বা সহিংসতা মোকাবেলায় প্রয়োজন হলে আদালতের হস্তক্ষেপ থাকা উচিত। কিন্তু এখন আদালত প্রায়ই সরকারপন্থী পক্ষ নেন—এটা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। প্রতিটি প্রার্থীকে সমান প্রচারের সুযোগ, সভা করার স্বাধীনতা এবং পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারপন্থীদের যেমন সুযোগ থাকে, বিরোধী দলগুলোকেও সেই সুযোগ দিতে হবে।
বর্তমানে শোনা যাচ্ছে, কিছু গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তির চাপের মুখে ফেব্রুয়ারিতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এখনো কি দেশে সেই সংস্কার সম্পূর্ণ হয়েছে? না হয়নি, যার মাধ্যমে দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে না। এই দেশে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বারবার। কিন্তু মানুষ জানে, তাদের হাতেই আছে প্রকৃত ক্ষমতা। আজ সময় এসেছে এই প্রশ্ন তোলার—রিফর্ম ছাড়া কেন নির্বাচন হবে? কেন জনগণ শুধু তামাশা দেখতে যাবে? সংবিধানের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্র হত্যা বন্ধ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে শাসক দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনের আগে রিফর্ম, তারপরই ভোট—এই হোক জনগণের একমাত্র দাবি। বাংলাদেশ আর একটি ভোট-তামাশা দেখতে চায় না। জনগণ চায় অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। এবং সেটি সম্ভব শুধু তখনই, যখন নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মূলগত পরিবর্তন বা পূর্ণ সংস্কার সাধিত হবে।
