বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি এখন ক্রমশ একটি ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে সরে এসে রাজনৈতিক প্রভাবের এক প্রতিচ্ছবিতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিচয় বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ, ইসরাফিল খসরু কিংবা রাশনা ইমামের মতো নামগুলো কেবল ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানেই সুযোগের একচেটিয়া অধিকার। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের বংশগত ও রাজনৈতিক প্রভাব খোলামেলাভাবে জায়গা করে নেয়, তখন সেটি আর জনগণের প্রতিষ্ঠান থাকে না, বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিসিবির ভেতরে যে অস্বচ্ছতা, পক্ষপাতিত্ব এবং গোপন সমঝোতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দেশের ক্রিকেটকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত ক্রিকেটের উন্নয়ন, প্রতিভা খোঁজা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কিন্তু সেখানে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে, তাহলে সেটি আর ক্রীড়া উন্নয়নের জায়গা থাকে না এটি পরিণত হয় ক্ষমতার আরেকটি খেলায়।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে একের পর এক নগ্নভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে, তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিকে ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া। যে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং ভারসাম্যের প্রতীক হওয়ার কথা, সেগুলো এখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুগত যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত প্রবণতা। বাংলাদেশ ব্যাংককে যেভাবে দখল করে সেটিকে কার্যত নির্বাহী ক্ষমতার অধীনস্ত করা হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। একই ধারা অনুসরণ করে যদি মানবাধিকার কমিশনকেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত বা সত্য উদ্ঘাটনের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা থাকবে এমন আশা করা সরলতা ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ যে মন্ত্রণালয় নিজেই অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু, তার অধীনে থাকা একটি কমিশন কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। এটি কেবল জবাবদিহিতার কাঠামোকে দুর্বল করবে না, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আড়াল করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করবে।
সরকারের ভূমিকা এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ তারা কেবল এই দলীয়করণকে থামাতে ব্যর্থ হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করেছে বলেই মনে হয়। ক্রীড়াকে যেখানে জাতীয় ঐক্য ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখা উচিত, সেখানে সেটিকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এটি শুধু দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। বিসিবির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা না যায়, তাহলে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যারা মাঠে পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে চায়, তারা যখন দেখে যে সিদ্ধান্ত আসছে অন্য জায়গা থেকে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে তাদের স্বপ্ন হারাতে থাকে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং একটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ অভাব, যা এই পুরো ব্যবস্থাকে আরও অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক করে তুলছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রশ্নের উত্তর না দেয়, সমালোচনাকে উপেক্ষা করে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে অনাগ্রহী থাকে, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে যেখানে ভুল সিদ্ধান্তেরও কোনো পরিণতি থাকে না। বিসিবির বর্তমান অবস্থা সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে, যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার জায়গা দখল করে নিয়েছে ক্ষমতার প্রভাব এবং নীরব সমর্থন। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল আংশিক সংস্কার নয়, বরং একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও পেশাদার করা হবে। অন্যথায়, দেশের ক্রিকেটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো ধীরে ধীরে এমন এক সংকটে পৌঁছাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
