CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি কোথায়? সরকারের কাছে জবাব চাই

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের লাখ লাখ শ্রমিক প্রতিদিন নিজেদের ঘাম, শ্রম ও সময় দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ সেই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা অত্যন্ত নির্মম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাঁদের প্রতিদিন হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করেও অনেক শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। অনেকের কাছে মাসের শেষ সপ্তাহ মানেই ধারদেনা করে সংসার চালানোর নতুন সংগ্রাম। প্রশ্ন হচ্ছে, যে শ্রমিকদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও শিল্প খাত এগিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব কার? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর দল বিএনপি সরকারের কাছে আমরা জানতে চাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? রাষ্ট্রের উন্নয়ন যদি কেবল শিল্পমালিকদের মুনাফা, রপ্তানি আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কীভাবে? দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই সাফল্যের অংশীদার হবেন শ্রমিকরাও। শ্রমিকের পেটে খাবার নেই, অথচ দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প শোনানো হচ্ছে, এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা চরমভাবে মানবাধিকার লজ্ঞন। একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া, অনুগ্রহ কিংবা রাজনৈতিক উপহার নয় এটি তাঁদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নে সরকারের আর কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে আর দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, বাজারদর এবং পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনা করে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। সেই মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিক যেন অন্তত পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি সত্যিই শ্রমিকবান্ধব হওয়ার দাবি করে, তাহলে সেই দাবির প্রমাণ দিতে হবে বাস্তব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ; কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা। তারেক রহমানের সরকার কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে? নাকি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিও অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মতো ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে? শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মালিকপক্ষের মুনাফার হিসাবকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় বানানো যাবে না। শ্রমিকের জীবন, শ্রমের মূল্য এবং পরিবারের ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা কোনো অবাস্তব দাবি করছি না আমরা চাই পরিশ্রমী মানুষ যেন তাঁদের শ্রমের বিনিময়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পান।

সরকারের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দেশের শিল্পমালিকদের স্বার্থ রক্ষায় যদি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, বৈঠক এবং নীতিনির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির ক্ষেত্রে এত ধীরগতি কেন? শ্রমিকরা কি এই দেশের নাগরিক নন? তাঁদের কি পরিবার নেই, সন্তান নেই, চিকিৎসার প্রয়োজন নেই? একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারখানায় কাজ করেন, তখন তাঁর শ্রমের ওপরই একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও মুনাফা নির্ভর করে। অথচ সেই শ্রমিক যখন ন্যায্য মজুরির দাবি তোলেন, তখন তাঁকে কেন অপেক্ষা করতে হবে? কেন তাঁর দাবিকে আলোচনার পর আলোচনা এবং আশ্বাসের পর আশ্বাস দিয়ে পিছিয়ে দেওয়া হবে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের উচিত অবিলম্বে শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কার্যকর আলোচনার ব্যবস্থা করা। তবে সেই আলোচনা যেন কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল না হয়। শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁদের মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রাখতে হবে। পাশাপাশি শ্রম আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ, বেতন পরিশোধে অনিয়ম বন্ধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের আইনগত ও মানবাধিকার অধিকার লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের অসন্তোষের পেছনে তাঁদের বাস্তব জীবনসংগ্রাম রয়েছে। সেই সমস্যার সমাধান না করে কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সমস্যার মূল কারণ কখনো দূর হবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জনগণের শেষ কথা অত্যন্ত পরিষ্কার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিকে আর অবহেলা করবেন না। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার অর্থ কেবল ক্ষমতা ভোগ করা নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে পরিশ্রমী, অসহায় এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকার রক্ষা করাও সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে যে অবদান রাখছেন, তার যথাযথ স্বীকৃতি তাঁদের মজুরি ও জীবনমানের মধ্যেই প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আমরা এমন কোনো উন্নয়ন চাই না, যেখানে দেশের রপ্তানি আয় বাড়বে, শিল্পমালিকদের সম্পদ বাড়বে, অথচ উৎপাদনের মূল কারিগর শ্রমিকদের জীবন দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে থাকবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের রোডম্যাপ প্রকাশ করা। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থাও করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই জনগণের সরকার পরিচালনার দাবি করেন, তাহলে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর সরকার কেবল ক্ষমতাবানদের নয়, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষেরও সরকার। মনে রাখবেন, শ্রমিকের ঘাম দিয়ে দেশের অর্থনীতি গড়ে উঠবে, অথচ সেই শ্রমিকের পরিবার অভাবের মধ্যে দিন কাটাবে, এটা চরম মানবাধিকার লজ্ঞন আর এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও মানবাধিকার এখনই নিশ্চিত করুন। প্রতিশ্রুতি নয়, চাই কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত