CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী মক্কা অঞ্চলে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের কনস্যুলার মিশন আগে থেকে এ বিষয়ে অবহিত ছিল না বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিষয়টি জানতে পেরে বাংলাদেশ বর্তমান তারেক রহমানের বিএনপি সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এবং সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি তুলেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দুই নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বাংলাদেশ আগে জানতে পারল না কেন? তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনগত সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য আপিলের সুযোগ সম্পর্কে সরকার কী জানত? এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারের কাছ থেকে পাওয়া জরুরি। প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব শুধু ঘটনার পর ব্যাখ্যা চাওয়া নয়, বরং কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যথাসম্ভব সহায়তা নিশ্চিত করা। বিএনপি সরকারের কাছে তাই স্পষ্ট জবাবদিহি দাবি করা প্রয়োজন এই ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও স্বচ্ছ জবাবদিহি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বাস্তবে কী করছে? প্রবাসীরা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করেন, পরিবারের ভরণপোষণ করেন এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। অথচ তাঁদের কেউ বিদেশে গ্রেপ্তার হলে কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে রাষ্ট্রের সহায়তা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছায়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের মামলার বিষয়ে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন কী জানত, তাঁরা আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং তাঁদের পরিবার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিল কি না, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে। জেদ্দায় বাংলাদেশি কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম ছিল বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কিন্তু সেখানে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য উল্লেখ ছিল না। তাহলে বন্দিদের তালিকা পর্যালোচনা করে গুরুতর মামলাগুলো শনাক্ত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? সরকারকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সেই সম্পর্কের অজুহাতে নাগরিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করা যায় না। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রহণে রাষ্ট্র যতটা আগ্রহী, তাঁদের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও ততটাই দায়িত্বশীল হতে হবে।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আইনগত সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রেপ্তারের সময় এবং আইনজীবীর সহায়তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে পুরো ঘটনার আইনগত দিক সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সরকারের উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রায়ের অনুলিপি, মামলার বিস্তারিত তথ্য এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া। পাশাপাশি সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা মামলাগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবী ও অনুবাদকের সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে। সরকার যদি সত্যিই প্রবাসীদের কল্যাণে আন্তরিক হয়, তাহলে এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন সংবাদ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং প্রবাসী সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এই ঘটনার পর তারা কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সুসম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নে সরকার নীরব থাকবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য ও আদালতের রায়ের অনুলিপি চেয়েছে। এখন সরকারকে জানাতে হবে, দুই বাংলাদেশির মামলার বিষয়ে আগে কী তথ্য ছিল, কূটনৈতিক মিশন কেন তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের কথা জানতে পারেনি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে তার কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। বিএনপি সরকার যদি প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় আন্তরিক হয়, তাহলে কার্যকর আইনি সহায়তা, দূতাবাস ও কনস্যুলেটের জবাবদিহি এবং বন্দিদের মামলার নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। প্রবাসীদের উপার্জন থেকে উপকৃত হওয়াই রাষ্ট্রের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বিপদের সময় তাঁদের অধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়ানোও রাষ্ট্রের কর্তব্য। জনগণ এখন জানতে চায়, সরকার কি এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, নাকি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকবে? দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছিল কী করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী করবে বিএনপি সরকারকে জনগণের সামনে তার স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।