CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

ড. ইউনূসকে হেনস্তা: বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে ধরে অপমানজনক স্লোগান, হেনস্থা ও কটূক্তির ঘটনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সরকারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একজন নোবেলজয়ী ও বাংলাদেশ অন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত, বিদেশের মাটিতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সরকারের দায়িত্ব কী? সরকার কি শুধু ক্ষমতার আসনে বসে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেবে, নাকি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নেও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে? ড. ইউনূসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত কিংবা তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে একজন ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে ঘিরে ধরে অপমান করার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও বড় প্রশ্ন হাজির করেছে: বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা কি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন? সরকার কি সম্ভাব্য বিক্ষোভের বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিল? যদি অবগত থেকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আর যদি অবগত না থাকে, তাহলে বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রম কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেবল জাতীয় পতাকা ও সরকারি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার অর্থ হলো দেশের মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। এই দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে তার জবাব দিতে হবে।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও নিরাপত্তা সমন্বয় কোথায় ছিল? একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশের মাটিতে হেনস্তার শিকার হলে তাঁর পাশে দাঁড়ানো সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আর ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্বের সফরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ব্যবস্থা রাখা। তবে মনে রাখতে হবে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের প্রত্যেক ব্যক্তিগত সফরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত তথ্য ছাড়া দেওয়া যায় না। তাঁর সফরের প্রকৃতি, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সরকার যদি কেবল নিন্দা ও আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনমনে সন্দেহ আরও বাড়বে। বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের দায়িত্ব কী ছিল, তাঁরা কখন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে থেকে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। সরকারের দায়িত্ব শুধু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সহায়তার ব্যবস্থা করা নয়; সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়াও দায়িত্বশীল প্রশাসনের অংশ। বিএনপি সরকার যদি দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনার দাবি করে, তাহলে এই ঘটনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। জনগণ জানতে চায়, প্রটোকল ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, থাকলে কেন ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখা চলবে না।

বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের প্রশ্ন খুবই সরল: বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরও কেন মানুষকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে? সরকার পরিচালনা মানে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা করা কিংবা নিজেদের সাফল্যের প্রচার চালানো নয়। সরকার পরিচালনা মানে প্রশাসনিক দক্ষতা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রয়োজনের সময়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা। ড. ইউনূসকে ঘিরে বিমানবন্দরের ঘটনাটি প্রমাণ করে না যে বিএনপি সরকার সরাসরি এই হেনস্তার জন্য দায়ী। কিন্তু এই ঘটনা সরকারের কূটনৈতিক প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট মিশনের ভূমিকা এবং নিরাপত্তা সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। সরকার যদি মনে করে সবকিছু যথাযথভাবে করা হয়েছে, তাহলে সেই দাবির পক্ষে তথ্য প্রকাশ করুক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সম্ভাব্য বিক্ষোভের বিষয়ে কোনো পূর্বতথ্য ছিল কি না এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, তা জনগণকে জানানো হোক। আর যদি কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে তা স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায় কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না। বিএনপি সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। ক্ষমতায় থাকা মানে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যত বড়, জনগণের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতাও তত বেশি। ড. ইউনূসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়া এখন জরুরি।

ড. ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে। তাঁর সরকারের সিদ্ধান্ত, নীতি কিংবা কর্মকাণ্ড নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করলে গণতান্ত্রিক উপায়ে সেই মত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে কাউকে ঘিরে ধরে অপমান করা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণকে প্রতিবাদের মাধ্যম বানানো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় নয়। একইভাবে, এই ঘটনার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করাও উচিত নয়। তবে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। বিএনপি সরকারকে তাই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় কী ধরনের সমন্বয় করে এবং সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি রাখা হয়। ড. ইউনূসের ঘটনায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো বাংলাদেশিকেও এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সম্মান রক্ষা কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আজ ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আগামীকাল অন্য কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় বিরোধের চোখে না দেখে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিএনপি সরকার যদি সত্যিই জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে কথার বদলে কাজের মাধ্যমে তার প্রমাণ দিতে হবে। জনগণ জানতে চায়, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কোথায় ছিল, কী ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে সরকার কী করবে। এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সরকারের দায়িত্ব, কোনো অনুগ্রহ নয়।