CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার: দেশের গৌরব নাকি স্বৈরাচারের দোসর?

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যেখানে তাদের প্রধান দায়িত্ব, সেখানে অনেক সময় সেনাবাহিনীর কিছু ব্যক্তি সরকারের স্বৈরাচারী নীতির সহযোগী হয়ে ওঠেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার কি সেই ধরনের এক স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন?

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার প্রধান ভলকার তুর্ক যখন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যদি তারা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালায়, তবে তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে, তখন এটি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেনাপ্রধান ওয়াকার কি তখন স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং জনগণের পক্ষে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক সময় সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অংশ নেয়, বিরোধী মত দমন করে এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে ভূমিকা রাখে। যদি ওয়াকার সত্যিই স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকেন, তবে এটি সেনাবাহিনীর মৌলিক দায়িত্বের পরিপন্থী।

ভলকার তুর্ক যখন সতর্ক করলেন যে, আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হলে তাদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে, তখন হঠাৎ করেই সেনাবাহিনী তাদের অবস্থান পরিবর্তন করলো। এটি প্রমাণ করে, তারা আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বার্থ ও সুবিধার কারণে নিজেদের অবস্থান বদল করেছিল।

যদি সেনাবাহিনী সত্যিই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকত, তাহলে জাতিসংঘের হুঁশিয়ারির অপেক্ষা করত না। তারা প্রথম দিন থেকেই জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে সরকারের অন্যায় আদেশ প্রত্যাখ্যান করত।

শুধু তাই নয় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান ওয়াকারকে নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহর মন্তব্য অনুযায়ী, ওয়াকার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন, এবং একই সঙ্গে তিনি সেনা প্রধান সবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করতে রাজি হননি। এই দুটি বিষয়ই বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন তোলে।

হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে এটি স্পষ্ট যে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেনাবাহিনী সংবিধান অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যার কাজ শুধুমাত্র দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো রাজনৈতিক দলকে পুনর্বাসন করা নয়। যদি সেনাপ্রধান ওয়াকার সত্যিই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী একটি কাজ এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর অর্থ, ওয়াকার হয়তো পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল এবং সেনাবাহিনীর কিছু অংশ তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এটি বোঝায় যে, সেনাবাহিনী হয়তো সরাসরি ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেনি, তবে তারা রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করতে চেয়েছে এবং একটি পুরনো শাসন ব্যবস্থার পুনর্বাসন ঘটাতে চেয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী কি আসলেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকবে, নাকি তারা তাদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য আবারও রাজনৈতিক খেলায় অংশ নেবে?

বাংলাদেশের জনগণ সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক নয়, বরং একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে দেখতে চায়। এখন সময় এসেছে, সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে।