CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

হবিগঞ্জে এনসিপির নেতাদের ওপর হামলা: রাজনীতিতে সহিংসতার পুরোনো সংস্কৃতি কি আবার ফিরে আসছে?

গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপি ও সন্ত্রাসী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু মতের ভিন্নতার কারণে যদি হামলা, ভয়ভীতি বা শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে আমরা কি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি? দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধীদের দমন এবং মাঠের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ এসেছে। কিন্তু পরিবর্তনের প্রত্যাশার পরও যদি একই ধরনের আচরণ নতুনভাবে দেখা যায়, তাহলে জনগণের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। বিএনপি ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের আস্থা অর্জন করতে চাইলে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতকে সম্মান করা, বিরোধীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময় জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশের। মানুষ আশা করেছিল, দীর্ঘদিনের সংঘাতময় রাজনীতির পরিবর্তে দেশে শান্তি, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু হবিগঞ্জের মতো ঘটনায় যদি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সরকারের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। একটি সরকার শুধু উন্নয়ন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয় না; বরং তার অধীনে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, রাজনৈতিক কর্মীরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো দলের নেতাকর্মীরা অপরাধে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার হওয়া উচিত। কারণ ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় অন্যায় চলতে থাকলে সেটি আগের সরকারের মতোই একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি করে। জনগণ আর প্রতিশোধের রাজনীতি দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় ন্যায়বিচার এবং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা। অতীতে বিভিন্ন সরকার বিরোধী মত দমনের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। এখন যদি নতুন সরকারও একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়ে, তাহলে পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তারেক রহমানের বিএনপির জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা তারা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ধারাই চলবে? প্রশাসনের দায়িত্ব হলো কোনো দলকে রক্ষা করা নয়; বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। পুলিশ ও প্রশাসন যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা কখনোই অন্যায়কে বৈধতা দিতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের শক্তি দেখানো হয় বিরোধীদের দমন করে নয়, বরং বিরোধীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপেক্ষায় আছে। তারা এমন একটি দেশ চায় যেখানে একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হামলার শিকার হবে না, যেখানে প্রশাসন দলীয় নির্দেশে নয় বরং আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। হবিগঞ্জের ঘটনা যদি সত্যিই রাজনৈতিক হামলার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনের উচিত সহিংসতার পথ পরিহার করা। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতাদের আচরণের ওপর। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি যদি জনগণের বিশ্বাস ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাদের দেখাতে হবে যে তারা ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক চরিত্রেও পরিবর্তন এনেছে। গণতন্ত্র রক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ভিন্নমতকে সম্মান করা। বাংলাদেশ আর প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, দায়িত্বশীল ও মানবিক রাজনীতি দেখতে চায়।