এনসিপির জনসভায় ৬জুলাইয়ের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য আবারও একটি ভয়ংকর সতর্কবার্তা। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক সমাবেশে মানুষ নিজের মত প্রকাশ করতে যাবে, আর সেখানে যদি বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোথায় ছিল? একটি অন্তর্বর্তী বা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ আশা করেছিল যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, কিন্তু এমন ঘটনা সেই আস্থাকে বড় ধরনের আঘাত করে। পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ঘটনার পর মনে হচ্ছে প্রশাসনের প্রস্তুতি ও নজরদারি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে, শুধু ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কেন আগে থেকে এই ধরনের হামলা ঠেকানো গেল না, সেই প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে। যারা রাজনৈতিক মতের কারণে সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তারা গণতন্ত্রের শত্রু। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, হামলা করা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করার সংস্কৃতি বাংলাদেশকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। সরকার ও প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে দেশের মাটিতে কোনো রাজনৈতিক সন্ত্রাসের জায়গা নেই।
এই ঘটনার তদন্ত শুধু লোক দেখানো হলে চলবে না এর পেছনে যারা জড়িত, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কিন্তু জনগণ চায় পুরো ঘটনার সত্য উদঘাটন হোক। যদি আওয়ামীলীগ ও সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বা সমর্থক এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের ভয়ংকর প্রবণতা দেখা গেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন আমলে ক্ষমতা বা প্রভাব ব্যবহার করে সহিংসতার মাধ্যমে বিরোধীদের দমন করার চেষ্টা করতো। এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ কখনো নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ পাবে না। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো তারা কি সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে কিনা। শুধু বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী তদন্ত, আওয়ামীলীগের ও ছাত্রলীগের পুলিশ চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা, দ্রুত বিচার এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা। কোনো দলের কেউই অপরাধের ঢাল হতে পারে না এটাই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতি।
পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও আমার গভীর প্রশ্ন রয়েছে। একটি জনসভায় বিস্ফোরক নিয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারা মানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। কিন্তু বারবার যদি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা, সংঘর্ষ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। আমার মতে, প্রশাসনের উচিত কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সহিংস রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে পুরনো সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যারা বোমা, অস্ত্র বা ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করতে চায়, তারা আসলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমার বিশ্বাস, একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না।
এনসিপির জনসভায় সন্ত্রাসী বোমা বিস্ফোরণের হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের গভীর সংকটের প্রতিফলন। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেখানে মানুষ কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে তার ওপর। যদি রাজনৈতিক কর্মীরা ভয় নিয়ে সভা করতে বাধ্য হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো তারা অতীতের মতো রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ থেকে বের হয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। একইভাবে, নিজ দলীয় রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুম,খুন, চাদাবাজির অভিযোগ উঠছে, তাদেরও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে এবং অপরাধীদের রক্ষা না করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আমার মতে, বাংলাদেশের মানুষ আর রাজনৈতিক সহিংসতা দেখতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ রাজনীতি, আইনের শাসন এবং এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের একমাত্র ভিত্তি। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সত্য প্রকাশ এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
