CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

বিএনপি আর আওয়ামী লীগের যেখানে মিল: দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও চাঁদাবাজির রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে অনেক সময় পরস্পরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে দেখলে, ক্ষমতার রাজনীতির কিছু মৌলিক চরিত্রে তাদের মধ্যে অস্বস্তিকর মিল রয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিন্নমতকে চাপ দেওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসব বিষয় দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি একই ধরনের অভিযোগ ছাত্রদল বা অন্য কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে, তাহলে শুধু সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। আমার কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যে রাজনীতির বিরুদ্ধে বিএনপি একসময় জনগণের সমর্থন চেয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই একই ধরনের আচরণের অভিযোগ যদি তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে পরিবর্তনটা কোথায়? শুধু আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি বসানো যদি পরিবর্তনের অর্থ হয়, তাহলে সেটি কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কার নয়। জনগণ দল বদল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার চরিত্র বদল দেখতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সমালোচনা করে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়? একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো সে বিরোধী মত, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকের সমালোচনার অধিকার কতটা সম্মান করে। অথচ যদি সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন, মামলা, ভয়ভীতি, চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিরোধী কণ্ঠকে দুর্বল করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই সরকার আগের সরকারের পথ থেকেই খুব বেশি আলাদা থাকে না। আমার আপত্তি বিএনপির ক্ষমতায় থাকা নিয়ে নয়, আপত্তি হলো ক্ষমতায় এসে তারা যদি সেই একই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধরে রাখে। জনগণ আওয়ামী লীগকে শুধু আওয়ামী লীগ হওয়ার কারণে প্রত্যাখ্যান করেনি; তারা ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ ছিল। তাই বিএনপি যদি মনে করে শুধু আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই জনগণের সব ক্ষোভ শেষ হয়ে যাবে, তাহলে তারা ভুল করছে। তারেক রহমানের সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল আরও বড় একটি জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত এবং ভিন্নমত সহনশীল রাষ্ট্র। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে ক্ষমতার মুখ বদলালেও ব্যবস্থার চরিত্র বদলাবে না।

চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্নটি বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি। আওয়ামী লীগের সময়ে ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডারবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। সেই সময় বিএনপির নেতারা এসবের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরেছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তারা ক্ষমতায় এলে এমন সংস্কৃতি বন্ধ করবেন। কিন্তু এখন যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ছাত্রদল বা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনের বিরুদ্ধে একই ধরনের চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে জনগণের হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। সংগঠনের নাম ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রদল হলেই যদি দোকানদার, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার বা সাধারণ মানুষকে একই ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে এটাকে পরিবর্তন বলা যায় না। আমার দৃষ্টিতে এটি শুধু বিএনপির সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকট। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন কেন রাষ্ট্রের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করবে এই প্রশ্নের উত্তর কোনো দলই এখনো সন্তোষজনকভাবে দিতে পারেনি। তারেক রহমানের সরকারের সত্যিকারের পরীক্ষা এখানেই। তিনি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে নিজের দলের লোকজনের বিরুদ্ধেও একইভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হয়। দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হয়ে গেলে কোনো সরকারই জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারবে না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হতাশা হলো, সরকার বদলালেও রাজনৈতিক আচরণের মৌলিক কাঠামো খুব একটা বদলায় না। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, মামলা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির অভিযোগ তুলেছিল। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এবং তাদের কাছ থেকেই জনগণ একই ধরনের আচরণ দেখতে শুরু করলে প্রশ্ন উঠবেই তাহলে এত সংগ্রাম, এত আন্দোলন, এত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফল কী? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রতি আমার সমালোচনা তাই ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়; বরং ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করা একজন নাগরিকের অধিকার থেকেই এই প্রশ্ন। বিএনপি যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকে, তাহলে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে না, দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি সহ্য করবে না এবং সমালোচনাকারী নাগরিককে শত্রু মনে করবে না। সরকারকে সমর্থন করা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করাও নাগরিকের অধিকার। আমি মনে করি, বিএনপি যদি এই সহজ সত্যটি ভুলে যায়, তাহলে ইতিহাসের একই চক্র আবার ফিরে আসবে। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছিল শাসনের ধরন পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন যদি না আসে, তাহলে আজকের ক্ষমতাসীনদের নিয়েও আগামী দিনে মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।