বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রশাসনের প্রকাশ্য ও ক্রমবর্ধমান পক্ষপাতিত্ব, যা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয় বরং জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক পদে থাকা কর্মকর্তাদের আচরণে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিনিধি না হয়ে বিএনপির প্রতি একধরনের অস্বাভাবিক আনুগত্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন করছে। যাস্ট কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি বিএনপির নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রদলের ক্যাডাররা লাটি ও অস্র নিয়ে হাটছে, তাদের হাতে লাটি, অস্র থাকার পরও পুলিশ ছাত্রদলের কাউকে গ্রেফতার করলো না, এটিই স্পষ্ট পক্ষপাতীত্বের প্রমান। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রশাসনের এই পক্ষপাতিত্বের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং মানবাধিকারের ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যখনই প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন নির্বাচন আর অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকে না; বরং ভোট কারচুপি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পাতানো নির্বাচনের পথ সুগম হয়। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিএনপিকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও বিরোধী মতের মানুষের জন্য সেই একই সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ভোটারদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং হতাশা সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের এমন একপক্ষীয় ভূমিকার কারণে দেশ আবারও অতীতের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে জনগণের মতামতের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পায়।
এর সঙ্গে আরও ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যাস্ট তিন দিন আগেই গত ২১ তারিখে তিতুমীর কলেজে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যেই সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ০৮ জন আহত হয়েছেন যা দেশের শিক্ষাঙ্গন ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটিকে আমরা বলতে পারি নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের মুদ্রার এপিট-ওপিট। অতীতে যেমন, তেমনি সাম্প্রতিক সময়েও ছাত্রদল ভিন্নমত দমনে হুমকি, সন্ত্রাসী হামলা, মামলা এবং সংগঠিত ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের স্বাধীন চিন্তা, মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত হওয়ার অধিকার মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। ছাত্রদল কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালায় না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্লগার, একটিভিস্ট, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিকদের মাঝেও আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যা শিক্ষাঙ্গনকে জ্ঞানচর্চার জায়গা থেকে ভয় ও অনিরাপত্তার অঞ্চলে পরিণত করছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, প্রশাসন যখন এসব সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা সমাজে একটি ভুল বার্তা দেয় যেন রাজনৈতিক সহিংসতা একটি গ্রহণযোগ্য ও সহনীয় আচরণ। এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করে এবং অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি শক্তিশালী করে তোলে। ছাত্রদলের এই সহিংস ইতিহাস ও বর্তমান কার্যকলাপ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, ব্লগার, একটিভিস্ট, সাংবাদিক এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ হারাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া এই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর, ঝুঁকিপূর্ণ এবং নির্ণায়ক অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যখনই প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়ে কোনো একটি রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তখনই নির্বাচন অগণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়েছে। ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল, বিরোধী প্রার্থীদের উপর সন্ত্রাসী হামলা, ভয়ভীতি দেখানো, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় পাতানো নির্বাচন এই সবই আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। যদি আবারও প্রশাসনের সহায়তায় ভোটাধিকার লঙ্ঘিত হয়, যদি জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা হয়, তবে দেশ কেবল রাজনৈতিক সংকটে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে। এটি কোনো একটি দলের সমস্যা নয়; এটি দেশের সাধারণ জনগণ, তরুণ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক গভীর হুমকি। বাংলাদেশের জনগণ অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সাংবিধানিক অধিকার রাখে, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব এবং ছাত্রদলের সহিংস উপস্থিতি সেই অধিকারকে বাস্তবে অর্থহীন করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুতর ও ঐতিহাসিক। তাদের উচিত অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে বিএনপি বা যেকোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠন শক্তির জোরে অন্যদের অধিকার হরণ করতে না পারে। দেশের গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, কথা বলার অধিকার এবং নারীর স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং আইনের শাসনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
জনগণ ও দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যদি এখনই সচেতন, সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল না হয়, তবে এই পরিস্থিতি সাময়িক কোনো সংকট হিসেবে নয়, বরং একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত হুমকি হিসেবে গেঁথে যাবে। বর্তমান প্রশাসনের প্রকাশ্য বিএনপির পক্ষপাতিত্ব, ছাত্রদলের ধারাবাহিক সহিংসতা, চাদাবাজির প্রবণতা একত্রে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও অনাস্থার সংস্কৃতি তৈরি করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিরাপদ রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে যাবে। যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় যে তার ভোটের মূল্য আছে, তখন গণতন্ত্র কেবল কাগুজে কাঠামোয় পরিণত হয়। এই বাস্তবতায় জনগণকে নীরব দর্শক হয়ে থাকা চলবে না। ভোটের মাধ্যমে, নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে এবং শান্তিপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব হলো প্রশাসনের বিএনপির প্রতি রাজনৈতিক পক্ষপাত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা এবং ছাত্রদলের সহিংস ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। শুধু বিএনপিকে নয় সব রাজনৈতিক দলকে সমান নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত না করলে নির্বাচন কখনোই অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্যথায় বাংলাদেশ শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট আমলের মতো আবারও একপক্ষীয় ক্ষমতা, ভয়ভীতি ও সহিংসতার রাজনীতির দিকে ধাবিত হবে, যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর ক্ষতি ডেকে আনবে।
