ঝিনাইদহে ২৩মে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার খবর আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহ সফরে গিয়েছিলেন এবং জুমার নামাজ আদায়ের পর মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সরকারের গুন্ডাবাহিনীর সন্ত্রাসী ছাত্রদলের হামলায় ডিম, ইট, পাটকেল,পাথর নিক্ষেপ ও কিল, ঘুষির ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর হামলা নয়, বরং রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত। একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিএনপির যারা গণতন্ত্রের কথা বলে, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা বারবার এমন পরিস্থিতি দেখতে পাই, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা পরিণত হয় ভয়ভীতি, হামলা ও সংঘর্ষে। বিএনপির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুর্বল করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে ভয়, হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি করছে।
এই ঘটনার জন্য বিএনপি ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর এবং উদ্বেগজনক। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। কিন্তু যদি তাদের কোনো নেতাকর্মী বা সমর্থক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলায় জড়িত থাকে, তাহলে সেটি তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একজন রাজনৈতিক কর্মী অন্য একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেবে কি না, কোনো নেতা কোথায় সভা করবে বা কার সঙ্গে কথা বলবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার কোনো দল বা গোষ্ঠীর নেই। যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সহিংসতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে জনগণ কিভাবে বিশ্বাস করবে যে ক্ষমতায় গেলে বা ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক আচরণ করবে? আমার দৃষ্টিতে, যে কোনো দলের নেতাকর্মী যদি হামলা, ভয়ভীতি বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে, তাহলে তাদের কঠোরভাবে নিন্দা করা উচিত। রাজনৈতিক মতের বিরোধ থাকতে পারে, তর্ক থাকতে পারে, প্রতিবাদ থাকতে পারে, কিন্তু হামলা কখনোই গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা হতে পারে না।
একই সঙ্গে সরকারের ভূমিকাও কঠোর সমালোচনার দাবি রাখে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী যদি প্রকাশ্যে হামলার শিকার হন এবং সেই পরিস্থিতি প্রতিরোধে প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না। সরকার যে দলই পরিচালনা করুক না কেন, তাদের দায়িত্ব সমানভাবে সব রাজনৈতিক শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে শুনে আসছে যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে যখন রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তখন সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমি মনে করি, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যারা দায়ী তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা উচিত। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় যে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার বা দৃশ্যমান জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না। এর ফলে অপরাধীরা উৎসাহ পায় এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক সংকটময় অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ সেই সংকটেরই আরেকটি প্রতিফলন। একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা মসজিদে নামাজ আদায় করে বের হওয়ার পর যদি হামলার মুখে পড়েন, তাহলে সেটি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দেয়। আমি বিএনপি, ছাত্রদল, সরকার এবং দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানাই যে তারা প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখুক। রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো দলের দীর্ঘমেয়াদি লাভ বয়ে আনে না; বরং এটি গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আজ প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তখনই উজ্জ্বল হবে, যখন রাজনৈতিক মতভেদ রাস্তায় ইট-পাটকেল দিয়ে নয়, যুক্তি, বিতর্ক এবং জনগণের রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
