CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

চাঁদপুরে ছাত্রদলের হামলা: বিএনপি সরকারের আমলে আইনের শাসন কোথায়?

চাঁদপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় ছাত্রশক্তি ও জাতীয় যুবশক্তির নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদপুর বড় স্টেশন এলাকায় জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান তানিমকে অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করা হয় বলে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তাঁর মুখ ও পায়ে আঘাত লাগে। এরপর এই ঘটনার বিচার চাইতে থানায় গেলে সন্ধ্যায় আবারও এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর বর্তমান বিএনপি সরকারের পালিত সন্ত্রাসী ছাত্রদল হামলা করে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মানুষ যখন বিচার চাইতে পুলিশের কাছে যায়, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ চাঁদপুরে পুলিশ পালিয়েছিল এবং এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিএনপি যদি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় থাকা আর বাস্তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা করা এক বিষয় নয়। বিএনপি সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ শুধু বক্তব্য শুনতে চায় না, তারা নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি দেখতে চায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না। যে রাজনীতিতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে, সেই রাজনীতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, বরং জনগণের আস্থা দুর্বল করে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা থানার ভেতরে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা থানায় উপস্থিত এনসিপি, ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির সদস্যদের ওপর হামলা চালায় এবং তাঁদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। একই সময়ে পুলিশ থানা ছেড়ে চলে যায় বলে বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি থানার কাজ হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু বিচার চাইতে গিয়ে যদি মানুষকে নতুন করে হামলার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পুলিশ কেন থানা ছেড়ে চলে গেল, সেখানে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কী করছিলেন এবং হামলার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কোথায় ছিল, এসব প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত বাহিনী নয়। পুলিশের দায়িত্ব বিএনপি, এনসিপি কিংবা অন্য কোনো দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়; বরং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। থানার ভেতরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়িত্বে অবহেলা করা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে, ছাত্রদলের নেতৃত্বকেও স্পষ্ট করতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে তাদের কর্মীরা কেন সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে বলে এমন ঘটনা সামনে আসছে। রাজনীতি কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে না।

বিএনপি ও ছাত্রদলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্রের কথা বলার পরও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিয়ে কেন বারবার প্রশ্ন উঠবে? একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব মতাদর্শ থাকতে পারে, দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধও থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে কাউকে মারধর করা, ভয় দেখানো কিংবা বিচার চাইতে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেই। ছাত্রদল যদি নিজেদের ছাত্রসমাজের অধিকার রক্ষার সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিতে চায়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক আচরণেও সেই দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন থাকতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তুলবে। বিএনপির নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো নিজেদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কোনো অন্যায়কে দলীয় আনুগত্যের আড়ালে লুকিয়ে না রাখা। ক্ষমতায় থাকা মানে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে জনগণের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা আরও বেশি। বিএনপি যদি অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে চায়, তাহলে বর্তমানেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষায় একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। নিজের দলের জন্য এক ধরনের ন্যায়বিচার এবং প্রতিপক্ষের জন্য অন্য ধরনের আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চাঁদপুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বিএনপি সরকার ও ছাত্রদলের নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

চাঁদপুরের ঘটনা নিয়ে সরকারের নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। জনগণ জানতে চায়, থানার ভেতরে কী ঘটেছিল, পুলিশ কেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার যদি রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে আন্তরিক হয়, তাহলে তাকে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। মেহেদী হাসান তানিমের ওপর হামলার ঘটনা থেকে শুরু করে থানায় গিয়ে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে আরও বিপদের মুখে না পড়েন। বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার নাম নয়; গণতন্ত্রের অর্থ হলো বিরোধী মতের মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ রাখা। ছাত্রদলকেও বুঝতে হবে, রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করে সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা গেলেও তাতে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। চাঁদপুরের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি আরও কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়বে। জনগণের দাবি পরিষ্কার: রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে, পুলিশের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের। তাই জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে অবহেলা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার খর্ব করার কোনো চেষ্টাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।