বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি প্রধান দলের মধ্যে লড়াই চলছে দীর্ঘদিন ধরে—একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দুই দলের পালাবদলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন নির্ধারিত হয়েছে, তেমনি জনগণের মনে একধরনের গভীর হতাশাও জন্ম নিয়েছে—বিশেষ করে দুর্নীতির ব্যাপারে।
বিএনপি ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬—এই দুটি মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এই সময়গুলিতে বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যার ফলে দেশে আন্তর্জাতিকভাবে কলঙ্কজনক সুনাম অর্জিত হয়েছিল—বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে। বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময়— টিআইবি (Transparency International) বাংলাদেশের নাম টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। বড় বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে জড়ায় সরকারের শীর্ষ নেতারা। বিদ্যুৎ খাত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে অস্বচ্ছতা, কমিশন বাণিজ্য, ও দলীয় নিয়োগের কারণে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তারেক রহমান, যিনি দলীয়ভাবে ‘ভবিষ্যতের নেতা’ হিসেবে পরিচিত, তিনি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া নিজেও দুইটি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে ঘুষ, কমিশন, বিদেশে অর্থ পাচার ও রাষ্ট্রীয় তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত। এইসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিএনপির রাজনীতি শুধু আদর্শ ও গণতন্ত্রের মুখোশে ঢাকা ছিল, কিন্তু ভেতরে ছিল এক অর্থকেন্দ্রিক ও পরিবারতান্ত্রিক দুর্নীতির সংস্কৃতি।
বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় তারা শুধু অর্থ লুটেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিণত করেছিল- বিএসইসি, বিআরটিএ, পল্লী বিদ্যুৎ, ভূমি অফিসসহ প্রায় সব খাত দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। দলীয়করণ ও অবৈধ কমিশন বাণিজ্যের কারণে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা উপেক্ষিত হয়েছিলেন। সরকারি প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, যার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। এখানে প্রশ্ন জাগে—এই দল যদি আবার ক্ষমতায় আসে, তারা কীভাবে দেশের জন্য স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনীতি গড়বে?
বিএনপি সবসময় নিজেকে গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে দাবি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই গণতন্ত্রের চেয়ে অর্থ ও ক্ষমতা রক্ষা তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা, বিরোধীদের দমন এবং নির্বাচনী কারচুপি—এসবই বিএনপির শাসনামলে দেখা গেছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে প্রশ্ন তোলে—তারা কী সত্যিই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, না শুধু ক্ষমতার লোভে রাজনৈতিক নাটক করে? বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তারা দুর্নীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকারী নেতারা ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করেছেন।
বিএনপির রাজনীতির ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের আগে প্রমাণ করতে হবে যে— তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেবে। অতীতের দুর্নীতির জন্য দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে এবং তাদের নেতৃত্বে থাকবে সৎ ও স্বচ্ছ চরিত্রের মানুষ। নইলে শুধু আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে নয়, নিজের ঘর দুর্নীতিমুক্ত না করে, বিএনপি কখনোই একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না। দুর্নীতি থেকে দেশের রাজনীতি মুক্ত না হলে, বাংলাদেশ কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে এগোতে পারবে না—যেই দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন।
