দেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, হয়তো এবার তারা ভয়, দমন-পীড়ন, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পেশিশক্তির সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে সেই আশার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের রাজনৈতিক মিত্র ও ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একের পর এক হামলা, গুম, খুন,হত্যা, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সামনে আসছে। সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নে ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় আহত আব্দুর রকিব ঝনুর মৃত্যুর খবর আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ৮ আগস্ট রাতে শ্রীডাঙার মোড়ে হামলায় লোহার রডের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বিএনপি ও তাদের সন্ত্রাসী ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের হামলায় এ সহিংসতার ঘটিয়েছে, তাহলে প্রশ্ন শুধু কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক বিএনপির সংস্কৃতি নিয়ে, প্রশ্ন ওঠে সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের নিরাপত্তার কথা বলা সহজ কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের সংগঠনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই আসল পরীক্ষা। আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যদি রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করার সাহস দেয়, তাহলে রাষ্ট্রের আইন কোথায় দাঁড়ায়? সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করে, তাহলে ছাত্রদল বা বিএনপির পরিচয় কোনো অপরাধীর জন্য ঢাল হতে পারে না।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবারও ছাত্রদলের অস্ত্র ও পেশিশক্তির রাজনীতির ছায়া দেখা যাচ্ছে। গত ৪, ৫ ও ৬ আগস্ট দেশের অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের যে খবর সামনে এসেছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছাত্ররাজনীতির চিত্র হতে পারে না। আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসূচিতে বাধা এবং বহিরাগত প্রবেশের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক, জকসু নেতাসহ দুই শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আরও ভয়াবহ হলো, লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ভাঙচুর এবং এমনকি হাসপাতালের ভেতরেও হামলার অভিযোগ ওঠা। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়; এটি জ্ঞান, মুক্তচিন্তা, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। অথচ ছাত্ররাজনীতির নামে যদি ক্যাম্পাসে ভয় তৈরি হয়, সাধারণ শিক্ষার্থী যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকে, তাহলে সেই রাজনীতি ছাত্রদের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের কাছে আমার সরাসরি প্রশ্ন হলো, তারা কি সত্যিই ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ চান, নাকি নিজেদের সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠনের আধিপত্যকে রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে চান? বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের আমলের ছাত্রলীগের পেশিশক্তির রাজনীতির সমালোচনা করে থাকে, তাহলে একই ধরনের অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে উঠলে নীরব থাকার কোনো নৈতিক অধিকার তাদের নেই। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে নীতি প্রযোজ্য ছিল, ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অন্যথায় শুধু সংগঠনের নাম বদলাবে, কিন্তু সন্ত্রাসের সংস্কৃতি বদলাবে না।
আরেকটি বিষয় চাঁদাবাজি, গুম, খুন, হত্যা, দখলদারিত্ব, অপহরণ, ডাকাতি কিংবা অপরাধের অভিযোগ যখন বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ঘিরে ওঠে, তখন সরকার ও দলীয় নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়া। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পুরোনো প্রভাব কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি এমন অভিযোগ ও প্রতিবেদন সামনে এসেছে। পরিবহণ, পাথর কোয়ারি, ফুটপাত ও সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ কর্মকাণ্ডে বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু প্রভাবশালী নেতা-কর্মীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ আছে। সত্যি বলতে, জনগণের কাছে এটি অত্যন্ত হতাশাজনক একটি বার্তা। কারণ মানুষ সরকার পরিবর্তন চায় শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলানোর জন্য নয় তারা চায় চাঁদাবাজমুক্ত রাস্তা, দখলমুক্ত ব্যবসা, নিরাপদ জীবন এবং আইনের সমান প্রয়োগ। যদি আওয়ামী লীগের সময়কার চাঁদাবাজির জায়গায় বিএনপির বা সন্ত্রাসী ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বসে, তাহলে জনগণের কাছে সেটি কোনো পরিবর্তন নয় এটি কেবল চাঁদাবাজির মালিকানা বদল। আরও ভয়াবহ হলো, এসব নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরেই কোন্দল, সংঘর্ষ ও হতাহতের খবর আসা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপনি কি এমন একটি বিএনপি ও ছাত্রদল চান, যেখানে ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করবে? নাকি এমন একটি দল চান, যার নেতা-কর্মীরা নিজেদের পরিচয়কে জনগণের সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে দেখবে? সরকার যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ গড়ার দাবি করে, তাহলে দলীয় পরিচয়ে অপরাধের অভিযোগকে প্রশ্রয় না দিয়ে তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সরকার নিজের লোকের বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ করতে ভয় পায় না।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়গুলোর একটি হলো রাজনৈতিক সুবিধার জন্য পুরোনো সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংস্কৃতির লোকদের নতুন দলে জায়গা করে নেওয়া। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাত্রদলের সদস্য ফরম নেওয়ার খবর এবং গাজীপুরে ছাত্রলীগের প্রায় একশ নেতা-কর্মীর বিএনপি ও যুবদলে যোগদানের ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে আনে তাহলে কি আদর্শ বদলেছে, নাকি শুধু রাজনৈতিক আশ্রয়ের ঠিকানা বদলেছে? যারা কয়েক বছর আগে আওয়ামীলীগের দলের হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছিল বলে অভিযোগ ছিল, তারা আজ ফুলের তোড়া হাতে বিএনপি ও ছাত্রদলের পতাকার নিচে দাঁড়ালেই কি তাদের অতীত মুছে যায়? এর উত্তর স্পষ্ট না। একইভাবে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের যেসব অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, সেগুলোর প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর বিচার হওয়া উচিত। কোনো অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি তদন্ত ছাড়াই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ঠিক নয়। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগ জমতে থাকলে সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোনো দলের রাজনৈতিক সম্পত্তি নয়। তারেক রহমান যদি সত্যিই প্রমাণ করতে চান যে তার বিএনপি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করবে না, তাহলে তাকে কথায় নয়, কাজে সেটা দেখাতে হবে। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ বিএনপি প্রকাশ করেছিল, আজ একই মানদণ্ড সন্ত্রাসী ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। নইলে ইতিহাসের কাছে প্রশ্ন থেকেই যাবে শুধু সন্ত্রাসীর পোশাক ও দলের পতাকা বদলেছে, নাকি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলেছে? জনগণ আর পুরোনো সন্ত্রাসের নতুন সংস্করণ দেখতে চায় না, তারা চায় এমন রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতাবান দলের কর্মী হলেও অপরাধ করলে আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না।
