CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে

‘তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’ এটি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা, হতাশা ও ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি। একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে মানুষের জীবন সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু ক্ষমতায় বসে যদি সেই সরকার মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকেই উপেক্ষা করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে এই সরকার কার জন্য এবং কাদের স্বার্থে কাজ করছে? বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানুষের কল্যাণের কথা বলে রাজনীতি করেছে। কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই কথাগুলো বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা নিয়ে মানুষ যদি অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে শুধু আগের সরকারের ব্যর্থতার গল্প শুনিয়ে বর্তমান সরকার দায় এড়াতে পারে না। জনগণ অতীতের হিসাব যেমন চায়, তেমনি বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছ থেকেও দৃশ্যমান ফলাফল চায়। ক্ষমতা কোনো পুরস্কার নয় এটি জনগণের দেওয়া আমানত ও দায়িত্ব। তাই বিএনপি সরকারের কাছে পরিষ্কার দাবি অজুহাত নয়, মানুষকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সহজলভ্য জ্বালানি, স্থিতিশীল সরবরাহ এবং কার্যকর জনসেবা দিতে হবে।

আজকের বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা চায় ঘরে বিদ্যুৎ থাকুক, রান্নার জ্বালানি সহজলভ্য হোক, পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকুক এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চলুক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু একটি বিলের ওপর পড়ে না এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে খাদ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং পরিবারের মাসিক বাজেট। বিএনপি সরকার যদি মনে করে জনগণ কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন চেয়েছিল, তাহলে তারা বড় ভুল করবে। মানুষ পরিবর্তনের পাশাপাশি কার্যকর রাষ্ট্রও চেয়েছে। বিরোধী দলে থাকার সময় সরকারের সমালোচনা করা সহজ; কিন্তু সরকার পরিচালনার সময় সমস্যার সমাধান করাই আসল পরীক্ষা। অতীতের ভুলের দায় স্বীকার করা যেতে পারে, কিন্তু প্রতিটি সমস্যার জন্য আগের সরকারকে দায়ী করে বর্তমানের ব্যর্থতা ঢেকে রাখা যায় না। জনগণ জানতে চায় জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে স্থায়িত্ব কোথায়? দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা কোথায়? বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যদি এসব প্রশ্নের জবাব দিতে না পারে, তাহলে জনগণের ক্ষোভ আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক।

বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল হবে জনগণের অসন্তোষকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া। যে মানুষ প্রতিদিন বাজারে যায়, বিদ্যুৎ বিল দেয়, বাসভাড়া দেয় এবং পরিবারের খরচ চালায়, তার অভিজ্ঞতাকে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে অস্বীকার করা যায় না। সরকারকে বুঝতে হবে, ক্ষমতার আসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা সহ্য করার দায়িত্বও আসে। সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ কিংবা সাধারণ মানুষ সরকারের জবাবদিহি চাইলে সেটিকে শত্রুতা হিসেবে দেখা গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ নয়। বরং জনগণের অভিযোগ শুনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট যদি থাকে, তাহলে সরকারকে সৎভাবে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধানের পরিকল্পনা দিতে হবে। জনগণকে বারবার আশ্বাস দিয়ে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না আনলে সেই আশ্বাস একসময় মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। বিএনপি যদি সত্যিই নিজেদের জনগণের দল হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট কমানো শুধু দলীয় সাফল্যের প্রচার নয়।

বর্তমান তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনা মানে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়, জনগণের আস্থা ধরে রাখা। আজ মানুষ যদি বলে, ‘তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’, তাহলে এই বক্তব্যকে কেবল স্লোগান হিসেবে দেখলে চলবে না; এর মধ্যে সরকারের প্রতি একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। জনগণ কোনো সরকারকেই অনন্তকাল সময় দেয় না। যে সরকার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারে না এবং নাগরিকের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে ব্যর্থ হয়, সেই সরকারের কাছে জনগণের প্রশ্ন থাকবেই। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে; তাই তাদের কাছ থেকে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার অবস্থান পরিষ্কার সরকারের সমালোচনা মানেই দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিক দায়িত্ব। বিএনপি যদি মানুষের কথা শুনে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল ঘটায়, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। আর যদি ক্ষমতার অহংকারে জনগণের ক্ষোভ উপেক্ষা করে, তাহলে সেই জনগণই একদিন গণতান্ত্রিকভাবে জবাব দেবে।