CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তাহলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে

বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলার আগে ভারতকে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে বন্ধুত্ব কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে নয়, বন্ধুত্ব হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ যে রাজনৈতিক ক্ষোভ, দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক সংকটের অভিযোগ করে এসেছে, সেটিকে উপেক্ষা করে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে না। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের যে অভিযোগ রয়েছে, তার বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হওয়া উচিত। কিন্তু ভারত যদি তাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে ভারত কি বাংলাদেশের জনগণের পাশে, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তির পাশে? বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে শত্রুতা চায় না, কিন্তু অসম্মানও মেনে নেবে না। একটি স্বাধীন দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের দাবি যদি কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র উপেক্ষা করে, তাহলে সেই সম্পর্ক কখনোই প্রকৃত বন্ধুত্বের রূপ নিতে পারে না। তাই ভারতের উচিত বাস্তবতা মেনে নেওয়া এবং বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি ও দাবিকে সম্মান করা।

শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়। ভারত যদি সত্যিই দাবি করে যে তারা বাংলাদেশের বন্ধু, তাহলে তাদের উচিত বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের পথে বাধা না হয়ে সহযোগিতা করা। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অনেক মানুষের অভিযোগ রয়েছে যে, তারা জনগণের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল। এর ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের মতামত, অধিকার ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সাবেক নেতা বা রাজনৈতিক মিত্রের সুবিধার জন্য একটি দেশের মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি উপেক্ষা করা বন্ধুত্বের পরিচয় হতে পারে না। ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর সেই আস্থা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিয়ে বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়াকে সম্মান করা।

ভারতের বর্তমান অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণ হলো অনেকেই মনে করেন ভারত অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে জনগণের চোখ দিয়ে দেখেনি। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মানে শুধু বাণিজ্য, সীমান্ত বা কূটনৈতিক সুবিধা নয়; সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো জনগণের বিশ্বাস। যদি বাংলাদেশের মানুষ মনে করে যে কোনো বিদেশি শক্তি তাদের ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার। কিন্তু তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে বিচার প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হলে তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়তে চায়, নাকি অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণ ধরে রাখতে চায়? কারণ জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সমতার সম্পর্ক চায়। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে জনগণের অধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের বন্ধু হতে চায়, তাহলে তাকে বাংলাদেশের মানুষের দাবিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত দিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষের বড় একটি অংশের কাছে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বন্ধুত্বের নামে কোনো দেশের জনগণের কষ্ট, ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যায় না। ইতিহাসে কোনো সম্পর্ক শুধু ক্ষমতাবানদের সমঝোতায় টিকে থাকে না; জনগণের বিশ্বাসই সেই সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। তাই ভারতের সামনে এখন একটি সুযোগ রয়েছে—তারা কি বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন আস্থার সম্পর্ক তৈরি করবে, নাকি একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে যুক্ত রাখবে। বাংলাদেশের মানুষ সম্মানজনক বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে ন্যায় ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এবং সরকারের পুলিশ-প্রশাসনের কাছেও জনগণের একটি স্পষ্ট দাবি থাকা উচিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের যেসব নেতা-কর্মী আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা, দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব যেন আইনের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। বিচার যদি হয়ে থাকে এবং আদালত যদি কাউকে অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে থাকে, তাহলে সেই রায় আইন অনুযায়ী কার্যকর করতেই হবে। একই সঙ্গে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এটি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; এটি আইনের শাসনের প্রশ্ন। বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ভোট দেয়নি, তারা ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগও প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু যদি দেখা যায় ক্ষমতার পালাবদলের পর পুরোনো অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার গড়িমসি করছে, আবার রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তাহলে জনগণের হতাশা আরও বাড়বে। তারেক রহমানের সরকারকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কোনো দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। জনগণ সরকারকে ক্ষমতায় বসায় এবং জনগণই প্রয়োজন হলে সেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামতে পারে। তাই আদালতের রায় বাস্তবায়নে গাফিলতি, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক আপসের পথ সরকারকে এড়িয়ে চলতে হবে। অন্যথায় জনগণের ক্ষোভ বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ব্যবহার করে মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নামলে তার দায়ও সরকারকেই নিতে হবে।