CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

বিএনপি ক্ষমতায় এসেই দুর্নীতি, ঘুষ আর ক্ষমতার অপব্যবহারের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে

বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণকে বলেছিল তারা দুর্নীতি করবে না, লুটপাট করবে না, রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির মুখোশ দ্রুত খুলে যাচ্ছে। বর্তমান তারেক রহমানের সরকার মেগা প্রজেক্টের নামে আবারও বড় বড় প্রকল্প, বড় বড় বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দ ঘিরে দুর্নীতি শুরু করেছে। যে বিএনপি একসময় আওয়ামী লীগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের কাছে জবাবদিহির কথা বলেছিল, আজ তাদের আমলেই মানুষ একই ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে। পার্থক্য শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র কি বদলেছে? কয়েক দিন আগে পুলিশের একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওসি পদায়ন নিয়েও কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের বিষয় সামনে এসেছে। একটি থানার ওসি হতে যদি কোটি টাকা লাগে, তাহলে সেই টাকা তোলার জন্য পরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কীভাবে টাকা আদায় করা হবে, সেটা জনগণ জানে ও বুঝে। পুলিশ যদি জনগণের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান না হয়ে পদ কেনাবেচার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে আইনের শাসন কোথায়? বিএনপি ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্নের জায়গায় মানুষের সামনে ফিরে আসছে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই নতুন সংস্করণ। জনগণ জানতে চায়, বিএনপি কি সত্যিই দুর্নীতি বন্ধ করতে ক্ষমতায় এসেছে, নাকি শুধু দুর্নীতির ভাগাভাগিতে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে এসেছে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের কাছে দেশের মানুষের প্রশ্ন এখন খুব সরাসরি। দেশে যখন খুন, গুম, ঘুষ, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং অপরাধ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অগ্রাধিকার কোথায়? জনগণ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু সরকারের ভেতরে যদি পদ, প্রভাব, নিয়োগ আর সুবিধা বণ্টনের রাজনীতিই বড় হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কে দেখবে? পুলিশের ওসি পদায়ন নিয়ে ঘুষের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে কার্যকর জবাবদিহি না থাকে, তাহলে এই প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত বলার কোনো সুযোগ নেই। আরও ভয়ংকর হলো, মানুষের চোখের সামনে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলেও ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলেকে বাবার রাজনৈতিক ক্ষমতা অপব্যবহার করে বিসিবিতে ঢুকবে কি না, তৃতীয় টার্মিনালের কাজ কে পাবে, কোন প্রকল্পে কার প্রভাব থাকবে, এসব নিয়ে যদি রাজনৈতিক মহলে ব্যস্ততা থাকে অথচ দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে জনগণ প্রশ্ন করবেই। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তার ছেলে কোথায় চাকরি করবে, কোন প্রতিষ্ঠান কোন সুবিধা পাবে, কোন প্রকল্পে কে সুযোগ পাবে এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন আর জনগণ রাস্তায় নিরাপত্তা খুঁজবে, এটা কোনো গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা হতে পারে না। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাতে রাজনৈতিক করা না হয়, ক্ষমতা জনগণের জন্য, ক্ষমতাবানদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের সুবিধার জন্য নয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকার ১৩ বছর বয়সী ছেলের হত্যার ঘটনা দেশের মানুষকে আবারও একটি নির্মম প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে: এই দেশে একজন সাধারণ মা তার সন্তানকে নিরাপদে বাইরে পাঠানোর নিশ্চয়তাটুকু কোথায় পাবেন? একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপরও একটি বড় প্রশ্ন। এর সঙ্গে যখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুষ, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অপরাধের বিস্তার উঠে আসে, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে যায়। বিশেষ করে সালাহউদ্দিন আহমেদের নিজের রাজনৈতিক এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেই জনগণের জবাব চাওয়া স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, তার রাজনৈতিক এলাকায় মাদক ব্যবসা শক্তিশালী ও কারখানায় পরিনত হয়েছে, তাহলে সেটি কি কেবল স্থানীয় সমস্যা বলে পাশ কাটানো যাবে? মাদক একটি পরিবারের সন্তানকে ধ্বংস করে, একটি সমাজকে ধ্বংস করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। অথচ সরকারের বক্তব্য শুনলে মনে হয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। বাস্তবতা যদি এতটাই ভালো হয়, তাহলে মানুষ কেন নিরাপত্তাহীন? কেন পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ? কেন মাদক নিয়ে এত অভিযোগ? কেন অপরাধের পর সাধারণ মানুষকে বিচার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়? বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি সত্যিই পরিবর্তনের কথা বলে থাকে, তাহলে এখন সেই পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে হবে। বক্তৃতা দিয়ে নয়, অপরাধী যত বড় রাজনৈতিক পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে।

সবচেয়ে বড় ভয়টা তৈরি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের জায়গায়। বাংলাদেশে মানুষ আগেও দেখেছে, আইনকে ব্যবহার করে কীভাবে রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক, ব্লগার এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ভয় দেখানো হয়েছে। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এসে এখন নতুন আইন তৈরি করেছে, যার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা, ব্লগার, সাংবাদিককে হয়রানি, আটক বা গুমের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির তৈরি হবে, সেই আইন নিয়ে প্রশ্ন আছেই। জনগণ এক স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আরেক স্বৈরশাসকের হাতে একই ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য গণতন্ত্র চায়নি। বিএনপি যদি সত্যিই গণতন্ত্রের কথা বলে তাহলে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো বিরোধী মতের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকারকে সমালোচনা করা অপরাধ নয়, সাংবাদিকের প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, ব্লগে সরকারের সমালোচনা করা অপরাধ নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে সমালোচকের মুখ বন্ধ করা গণতন্ত্র নয়। বিএনপি যদি আজ এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করে যেখানে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে লিখলেই ভয় পেতে হবে, তাহলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তারা যে অভিযোগগুলো করেছিল, সেগুলোর নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে। জনগণ শাসক পরিবর্তন চায়নি, তারা রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন চেয়েছে। বিএনপির সামনে এখন পরিষ্কার প্রশ্ন তারা কি সত্যিই জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়বে, নাকি ক্ষমতার পুরোনো আওয়ামীলীগের ফ্যাসিস্ট আমলের সংস্কৃতিকে চালিয়ে যাবে? বাংলাদেশের মানুষ আর একদলীয় সুবিধাভোগী রাজনীতি চায় না। তারা এমন রাষ্ট্র চায় যেখানে মন্ত্রী থেকে পুলিশ, নেতা থেকে আমলা, সবাই আইনের কাছে সমান।