বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে শ্রমিক কল্যাণ, সরকারি করপোরেশন, আইনজীবী প্যানেল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজ দলীয় বিএনপিপন্থী ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ মো. শামসুল আলম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য থাকা শামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এমন একজন ব্যক্তির নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। (bdnews24.com) নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে একজন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগ যদি জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি করে, তাহলে সেই দায় সরকারেরই। তারেক রহমানের সরকারকে তাই প্রশ্ন করতে হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে দলীয়করণের অভিযোগ বিএনপি বছরের পর বছর করেছে, ক্ষমতায় এসে সেই একই স্বৈরাচারী সংস্কৃতি কেন অনুসরণ করছে? একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থাই যদি নিয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নির্বাচন যতই নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হোক, তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বিএনপি যদি সত্যিই গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে থাকে, তাহলে তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখা।
রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের নিয়োগের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকার ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এসব নিয়োগের মধ্যে মো. সালাহউদ্দিন সরকারকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে; তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচিত। একই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মো. মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের প্রধান করা হয়েছে এবং এটিএম আবদুল বারী ড্যানিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি গ্রেড-২ পদেও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। (bdnews24.com) এখানে প্রশ্নটি হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ব্যবহৃত হবে? তারেক রহমানের সরকার যদি মনে করে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা মানেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ, তাহলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠান; এটি বিএনপির শ্রমিক সংগঠনের সাংগঠনিক সম্প্রসারণের জায়গা হওয়ার কথা নয়। একইভাবে BIWTC বা বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনও কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ নিয়ে বিএনপি যে কঠোর সমালোচনা করত, এখন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে যদি একই অভিযোগ ওঠে, তাহলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দলীয়করণ খারাপ, আর ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেটিই বৈধ? তারেক রহমানের সরকারের কাছে জনগণ জানতে চায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে পেশাগত যোগ্যতা, সততা ও নিরপেক্ষতাকে কি সত্যিই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো এত রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে কেন?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিচারব্যবস্থা ও আইনজীবী নিয়োগকে ঘিরে। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, যিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে পরিচিত। (en.somoynews.tv) এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ৩০ জুলাই ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ মোট ২৬৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগকে ঘিরে আবার বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একটি অংশই অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ করেছে। এমনকি কিছু বিক্ষোভকারী দাবি করেছেন, নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। (The Business Standard) দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতে PP ও GP পদেও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মৌলভীবাজারে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুনকে GP করা হয়েছে এবং অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন চৌধুরীকেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।(themoulvibazartoday.com) আইনজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ যদি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হচ্ছে এমন ধারণা তৈরি হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারেক রহমানের সরকারকে মনে রাখতে হবে, আদালত বিএনপির জন্য যেমন নয়, আওয়ামী লীগের জন্যও নয়; আদালত জনগণের। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর কাজ কোনো দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন নয়, রাষ্ট্রের পক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
বিএনপি ও তারেক রহমানের সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা এখানেই তারা যে ফ্যাসিস্ট স্বৈরচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কথা বলেছে, ক্ষমতায় এসে সেই ব্যবস্থার অনেক উপাদানই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধের কথা বলেছে। ২০২৩ সালের ৩১ দফায় বিএনপি বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়া এবং বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বিএনপি-নিয়ন্ত্রিত সংসদ সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করেছে যে সিদ্ধান্তকে The Daily Star-এর বিশ্লেষণ বিএনপির নিজস্ব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রশ্ন তুলেছে। (The Daily Star) তাহলে জনগণ কোন বিএনপিকে বিশ্বাস করবে বিরোধী দলের বিএনপিকে, যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নাকি ক্ষমতার বিএনপিকে, যার বিরুদ্ধে এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় লোক বসানোর অভিযোগ উঠছে? রুহুল কুদ্দুস কাজল, মো. শামসুল আলম, সালাহউদ্দিন সরকারসহ যাদের নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই এখানে মূল বিষয় নয়; প্রশ্ন হলো নিয়োগের কাঠামো ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। সব জায়গায় যদি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হয়, তাহলে সেটি হবে গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। তারেক রহমানকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবেন, নাকি বিএনপির ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠানের ওপর বসাবেন? কারণ দল বদলালেই স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না, ক্ষমতার ব্যবহার বদলালেই কেবল রাষ্ট্র বদলায়। অন্যতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিনতিও হবে মাফিয়া হাসিনার মতো।
