বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলোর কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে একটি পরিবার ও তাদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের চারপাশে কেন্দ্রীভূত করা। শেখ পরিবারকে ঘিরে ক্ষমতা, প্রভাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সুবিধার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে। কিন্তু আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মীর শাহে আলমকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো জনগণের সামনে ভয়াবহ একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে শেখ পরিবার সরেছে, নাকি শুধু পরিবারের নাম বদলেছে? মীর শাহে আলম এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। অথচ তাঁর নিজের এবং তাঁর ছেলে মীর শাকরুল আলম সিমান্তের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১২টি সরকারি চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যার মূল্য ৭১ কোটি টাকার বেশি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরেও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়েছে। একটি পরিবারের ব্যবসা যখন একই সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রের এত কাছে থাকে এবং সেই পরিবারের সদস্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তখন সেটিকে নিছক ব্যবসায়িক সাফল্য বলে পাশ কাটানো জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতারণার শামিল। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও এটিকে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখেছেন এবং বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের দাবি উঠেছে।
মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো সরকারি কাজের সঙ্গে তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক। সংবাদ অনুসন্ধানে দেখা গেছে তাঁর ও তাঁর ছেলের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ১২টি সরকারি চুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ছয়টি চুক্তি পাওয়া যায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, যখন শাহে আলম নিজেই বিসিকের পরিচালক ছিলেন। এরপর তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আরও ছয়টি চুক্তি, প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার, তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতে যায় বলে অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজও রয়েছে। একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী যখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন, তখন তাঁর নিজের পরিবারের ব্যবসা একই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার কাজ পেলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠবেই। এখানে শুধু “আমি টেন্ডার অনুমোদন করিনি” বললেই রাজনৈতিক দায় শেষ হয়ে যায় না। একজন মন্ত্রীর ক্ষমতা শুধু স্বাক্ষর করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বিএনপি সরকার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আগের সরকারের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতি হবে না। তাহলে জনগণ কেন এমন পরিস্থিতি দেখবে যেখানে মন্ত্রীর পরিবার সরকারি প্রকল্পের ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত? শেখ হাসিনার সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বিএনপি তুলেছিল, আজ একই ধরনের প্রশ্ন নিজেদের একজন প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে উঠলে বিএনপির নৈতিক অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? ক্ষমতার পালাবদল যদি শুধু সুবিধাভোগী পরিবারের পরিবর্তন হয়, তাহলে সেটি কোনো রাজনৈতিক সংস্কার নয়।
মীর শাহে আলমকে ঘিরে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ আরও তীব্র হয়েছে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় তাঁর নিজের ও তাঁর পরিবারের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়া বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্কের কারণে। সংসদে অভিযোগ উঠেছিল, বগুড়া-২ আসনে নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম ‘মীরবাড়ি’, ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ রাখা হয়েছে, যেখানে ‘মীরবাড়ি’ তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে এবং ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যায়। শাহে আলম সংসদে এই অভিযোগ অস্বীকার করে নামের মিলকে ‘অলৌকিকভাবে’ মিলে যাওয়া বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু বিতর্ক এতটাই তীব্র হয় যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন এবং নতুন নাম নির্ধারণে জনশুনানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সরকারি ই-জিপি নথিতেই শিবগঞ্জে ‘Mir Shahe Alam Auditorium’ এবং ‘Mir Shahe Alam Shishu Park’ নির্মাণের প্রকল্পের নাম দেখা যাচ্ছে। একজন জীবিত ক্ষমতাসীন রাজনীতিকের নিজের নামে সরকারি স্থাপনা তৈরির এই প্রবণতা বাংলাদেশের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগ ছিল। যে বিএনপি একসময় ব্যক্তিপূজা ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাদের সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় এমন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া কোনোভাবেই ছোট বিষয় নয়। রাষ্ট্র জনগণের টাকা দিয়ে তৈরি হবে, কিন্তু তার গায়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির নাম কেন থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ চাইতেই পারে। তারেক রহমান নিজেই যদি শেষ পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে বিতর্কটি সরকারকেও বিব্রত করেছে।
সবশেষে প্রশ্নটি শুধু মীর শাহে আলমকে নিয়ে নয় প্রশ্নটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক প্রভাব এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে তাদের নিজেদের ঘরের মানুষদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। মীর শাহে আলমের পরিবারের প্রতিষ্ঠান সরকারি চুক্তি পেয়েছে এটি সংবাদ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে; তাঁর পরিবারকে ঘিরে ৭১ কোটি টাকার বেশি সরকারি চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে; তাঁর নির্বাচনী এলাকায় তাঁর পরিবারের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়া ইউনিয়ন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে; এমনকি সরকারি নথিতে তাঁর নিজের নামে অডিটোরিয়াম ও শিশুপার্কের প্রকল্পও দেখা যাচ্ছে। এগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে শুধু “সব নিয়ম মেনেই হয়েছে” বললে জনগণের প্রশ্ন শেষ হবে না। বরং সরকারের উচিত প্রতিটি চুক্তি, টেন্ডার, প্রকল্প, নামকরণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এক পরিবারের জায়গায় আরেক পরিবারকে রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেখতে চায় না। শেখ পরিবার যদি ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রতীক হয়ে থাকে, তাহলে ‘শাহে আলম পরিবার’ যেন সেই একই পথের নতুন সংস্করণে পরিণত না হয়। তারেক রহমানের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো নিজের সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিএনপি যদি সত্যিই পরিবর্তনের সরকার হয়ে থাকে, তাহলে দলের লোকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করার সাহস তাদের দেখাতে হবে। অন্যথায় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে শেখ পরিবার গেছে, কিন্তু পরিবারতন্ত্র কি সত্যিই গেছে? নাকি শুধু ক্ষমতার ঘরের নাম বদলেছে?
