CategoriesDemocracyHuman RightsJusticePolitics

তারেক রহমান কি শেখ হাসিনার পথেই হাঁটছেন?

জনাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আপনাদের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল ক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। অথচ আজ আপনাদের সরকারের ক্ষেত্রেই যদি একই ধরনের প্রবণতার জন্ম নেয়, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে, পরিবর্তনটা আসলে কোথায়? ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর আচরণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি, চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আপনি ও আপনার দলের কাউকে নিয়ে কথা বললেই হামলা, মামলা নিয়ে অভিযোগ ও সমালোচনা উঠছে, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একজন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করা যাবে, তাঁর নীতির প্রশংসা করা যাবে, কিন্তু তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। আরও হতাশার বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে এসব অভিযোগের পরও আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট কঠোর ও স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা জনগণের সামনে আসছে না। আপনার নীরবতা যদি সম্মতি না-ও হয়, তবুও সেটি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে। আপনি কি সত্যিই চান আপনার চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হোক, যেখানে আপনার সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে? যদি না চান, তাহলে এখনই স্পষ্ট করুন প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁর দলের কোনো নেতাকর্মীও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

জনাব তারেক রহমান, রাষ্ট্র পরিচালনা আর দলীয় আধিপত্য বিস্তার এক জিনিস নয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম থেকে সিলেট দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক সংঘাত, হামলা, দখলদারিত্ব কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর অভিযোগ যখন সামনে আসে, তখন প্রশ্ন উঠবেই আপনার সরকার কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। বিএনপি এতদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দলীয় সন্ত্রাস, রাজনৈতিক দমন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করেছে। তাহলে জনগণ কেন আজ আপনাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ শুনবে? ক্ষমতার পরিবর্তন যদি শুধু ক্ষমতাবান ব্যক্তির নাম বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক আচরণ একই থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী? কোনো দলের কর্মী যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখায়, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে বা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। রাস্তায় রড নিয়ে শক্তি প্রদর্শন কখনো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; বরং এটি দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ। আপনার দলের কেউ যদি মনে করে সরকারি ক্ষমতার কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তাহলে সেই ধারণা ভাঙার দায়িত্ব আপনারই। মনে রাখবেন, রড বাহিনী যত সক্রিয় হবে, সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তত দুর্বল হবে। জনগণ হয়তো কিছু সময় নীরব থাকতে পারে, কিন্তু ভয়কে স্থায়ী রাজনৈতিক আনুগত্যে পরিণত করা যায় না।

তারেক রহমান, আপনাদের সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো আপনারা কি সত্যিই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে? ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি শাসন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু বিতর্ক, অভিযোগ ও সমালোচনা রয়েছে। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে যারা প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা নিশ্চয়ই চাইবেন না বাংলাদেশ আবার একই ধরনের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির দিকে ফিরে যাক। আজকের প্রজন্ম আরও বেশি সচেতন এবং তারা কোনো দলকেই অন্ধভাবে ক্ষমতা দিতে প্রস্তুত নয়। জনগণ এমন সরকার চায়, যেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে আইনের গুরুত্ব বেশি থাকবে এবং বিরোধী মত প্রকাশের অধিকার বাস্তবে সুরক্ষিত থাকবে। আপনার দলের নেতাকর্মীরা যদি ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে, তাহলে সেটি শুধু বিরোধীদের সমস্যা নয় শেষ পর্যন্ত সেটি আপনার সরকারের বৈধতা ও জনপ্রিয়তার ওপরও আঘাত করবে। আপনি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দাবি করেন, তাহলে আপনাকে নিজের দলের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধেই প্রথম কঠোর হতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসের পুরোনো অভিযোগগুলো নতুন করে ফিরে আসবে। জনগণ দেখতে চায়, আপনি কি দলকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, নাকি দলের কিছু শক্তিশালী কর্মী ধীরে ধীরে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ একটি সরকার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার কর্মীরা আইন মানে; ভয় দেখাতে পারে বলে নয়।

আপনাদের অবস্থান পরিষ্কার হওয়ার উচিত কোনো রাজনৈতিক নেতা, কোনো দল এবং কোনো প্রধানমন্ত্রীই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা হোক, শেখ মুজিবুর রহমান হোক কিংবা তারেক রহমান রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির কাজের সমালোচনা করার অধিকার জনগণের আছে। বরং একজন শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের সমালোচনা শুনতে পারেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং নিজের দলের অন্যায় কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাই আপনার কাছে আমার সরাসরি প্রশ্ন আপনি কি প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন যে বিএনপি, যুবদল বা ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আপনি কি নিশ্চিত করবেন যে আপনার সমালোচনা করার কারণে কোনো নাগরিককে ভয় দেখানো হবে না? যদি আপনি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে এসব বিষয়ে আপনাকে নীরব না থেকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, নেতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সেই নেতার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতা স্থায়ী নয়, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই সময় থাকতে পথ ঠিক করুন। রডের শক্তি, দলীয় প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে হয়তো কিছুদিন নীরবতা তৈরি করা যায়; কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় কেবল ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে।